admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
মুক্ত কলম, স্বাস্থ্য ডেক্সঃ বাংলাদেশে হার্ট রিংয়ের নতুন দাম নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সরকার সব ধরণের রিংয়ের দাম কমিয়ে দিয়েছে, যার প্রতিবাদে অনেক ব্যবসায়ী রিং বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশে হার্টের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হচ্ছে স্টেন্ট বা রিং পরানো। কারো হৃদপিন্ডে রক্ত সঞ্চালনে ব্লক বা বাধার সৃষ্টি হলে ডাক্তার তাকে এক বা একাধিক রিং পরানোর পরামর্শ দিতে পারেন। সেই রিংটা বাংলাদেশে আসে বিদেশ থেকে। সাধারণত ইউরোপ-আমেরিকা থেকে এগুলো আমদানি করেন ব্যবসায়ীরা। যার মূল্য তালিকা বিভিন্ন হাসপাতালে টানানো থাকে। রোগীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ তালিকা থেকে বেছে নেয়া রিং রোগীর হার্টে প্রতিস্থাপন করেন ডাক্তাররা।
তবে বদলে যাচ্ছে সেই মূল্য তালিকা। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর হার্টের রিং এর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সংক্রান্ত নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, যাতে সব ধরণের রিংয়ে আগের মূল্যর তুলনায় সর্বনিম্ন ১৩ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪১ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমানো হয়েছে। আর এটি ১৬ই ডিসেম্বর থেকে কার্যকরের কথা বলেছে সরকার। কিন্তু এই নতুন দাম নিয়ে আপত্তি দেখা দিয়েছে আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের একটা অংশে। মূল্য নতুন করে সমন্বয় না-করা পর্যন্ত স্টেন্ট সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখার কথা বলছেন তারা। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান দরকার হলে আবারও আলোচনায় বসবেন তারা।
নতুন মূল্য তালিকায় কী আছে?
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, একটা কমিটির মাধ্যমে অনেক দিন ধরে মিটিং করে, সবার সঙ্গে কথা বলে নতুন মূল্য তালিকা দেয়া হয়েছে। সবগুলোর দাম কমেছে আগের চেয়ে। আমরা প্রথমে ১৫-২০ দিন আগে আমেরিকান রিংয়ের দাম কমাই, এখন ইউরোপেরটা কমানো হল। সাধারণত যে রিং সবাই নেয়, যার দাম আগে আশি হাজার ছিল ওটা এখন ৬০ থেকে ৬২ হাজারে নেমে এসেছে, বলেন মি. ইউসুফ। এতে করে বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ রোগী বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায় সেই সংখ্যাটা কমবে বলে মনে করেন তিনি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, কার্ডিওলজিস্ট, বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবাইকে নিয়ে গঠিত কমিটি এই নতুন দাম নির্ধারণ করেছে। তবে তার আগে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে কমিটি।
হার্টের রিং এর নতুন মূল্যতালিকা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সরকারঃ বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যেমন জার্মানি, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ড থেকে রিং আসে। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকেও রিং আমদানি করা হয়। বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাশের দেশ ভারত বা নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে রিংয়ের মূল্য বহুগুণ বেশি ছিল এতদিন। ফলে অনেক রোগীই কম খরচে ভারতে চিকিৎসা করাতে যেত। নতুন মূল্য-তালিকায় দেখা যায় এই রিংগুলো আমদানি করতে অনুমতি পেয়েছে ২৭টা কোম্পানি। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রিংয়ের দাম ধরা আছে ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। আর অন্যান্য রিংয়ের মূল্য সর্বনিম্ন ১৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আয়ারল্যান্ডের রিং আছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
তবে প্রতিটি দেশের রিংয়েই আলাদা আলাদা ক্যাটেগরি ভাগ করা থাকে। আর ক্যাটেগরি অনুযায়ী দাম ওঠানামা করে।
ডাক্তার কোনও রোগীকে রিং বসানোর পরামর্শ দিলে রোগীর পক্ষ থেকে পছন্দসই দামের রিং চূড়ান্ত করা হয়। যার অর্ডার নেয় ভেন্ডর বা হাসপাতালের সাথে যুক্ত কোম্পানি এবং তারাই সেটা হাসপাতালে সরবরাহ করে। রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মাসুম সিরাজ বলেন, আমাদের দেশে এতদিন যে দাম নির্ধারণ ছিল সেটা ভারত-নেপালের চেয়ে অনেক বেশি। একই স্টেন্ট সেসব দেশে অনেক কমে বিক্রি হয়। আমি মনে করি সরকার একটা দারুণ কাজ করেছে। এই চিকিৎসক মনে করেন এরপরও লাভ থাকবে ব্যবসায়ীদের। মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, মূলত ভারতের সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। যেটা ওখানে ৬০০ ডলার, সেটা এখানে ৭৮০ ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। আমরা সেটা সমান করে দিয়েছি। ড. সিরাজও মনে করেন এতে করে এখন রোগীরা দেশেই চিকিৎসা করাতে উৎসাহ পাবেন।
ইউরোপ বনাম আমেরিকাঃ বাংলাদেশে রিং আমদানিকারকদের দুটো আলাদা দল আছে। একদিকে অল্প কিছু কোম্পানি যারা যুক্তরাষ্ট্রের রিং আমদানি করে। অন্য দিকে আছে মূলত ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের রিং আমদানিকারকরা। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বেঁধে দেয়া নতুন দামের পর এখন এক রকম মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে এই দুই পক্ষ। দাম নির্ধারণের একটা মার্কআপ ফর্মুলা আছে সরকারের। ফর্মুলা অনুযায়ী রিংয়ের কেনা মূল্যের চেয়ে ৪৩% বেশি রেখে দাম ঠিক করে দেয়া হয়। যার মধ্যে থাকে আমদানি খরচ, মার্কেটিং, ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ ও প্রফিট। কিন্তু এর মাঝে সরকার সেটা কারো সাথে আলোচনা না করেই কমিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করছেন আমদানিকারকরা।
এরপর মাঝে ডলারের বিনিময় মূল্য অনেক বেড়ে গেলে তিনটি কোম্পানি যারা যুক্তরাষ্ট্রের রিং নিয়ে আসে, তারা গিয়ে একটা আবেদন জানায় দাম বাড়ানোর। গত জুনে সেই বর্ধিত দাম কার্যকরও হয়। কিন্তু এরপর গত মাসে সেই দামটা আবারও কমিয়ে আনে ঔষধ প্রশাসন। একইসাথে এখন কমানো হল ইউরোপিয়ান রিংয়েরও দাম। আর এটা নিয়ে তাদের সাথে কোন আলোচনাই করা হয় নি বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান রিংয়ের বাজারজাতকরণ ও সরবরাহ নিয়ে কাজ করা হারুণ উর রশীদ। আমাদের উপর প্রাইসটা চাপিয়ে দিয়েছে। আমরা ইমপোর্ট করি, প্রাইস নির্ভর করে প্রিন্সিপালের (মূল কোম্পানি) উপর। হঠাৎ কয়েকটা কোম্পানি আবেদন করে দাম বাড়িয়ে নিল। এখন তাদেরটা কমাতে গিয়ে সবারটা কমিয়ে দিল”, বলছিলেন মি রশীদ।
এক্ষেত্রে অধিদপ্তর মার্কআপ ফর্মুলাও মানেনি বলে অভিযোগ তার। দাম নিয়ে এখন মুখোমুখি অবস্থানে ইউরোপ ওআমেরিকার আমদানিকারকরাঃ বিষয়টি স্বীকার করলেন আমেরিকান রিং আমদানি করা ভাসটেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনও। তার কথায়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিন্তু সবার সাথে আলাদা আলাদা করে বসার কথা। আমরা যেহেতু বসেছি এবং বেজ প্রাইসটা মেনে নিয়েছি এখন তাদেরও বসতে হবে। তবে আনোয়ার হোসেন জানান তারা যে মূল্য দাবি করেছিলেন তার চেয়েও কম মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার। অন্যদিকে নতুন করে দাম সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত রিং বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানান ইউরোপিয়ান রিং আমদানিকারকরা। আমরা সবাইকে অনুরোধ করছি এখন রিং ব্যবহার না করার জন্য। আমরা সরিয়ে নেইনি বা হুমকি দিচ্ছি না, শুধু যে বৈষম্য হচ্ছে সেটার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার না করার কথা বলছি। আমরা হয়তো লস করে ১-২টা দিতে পারবো, কিন্তু ৪০০-৫০০ তো পারবো না”, বলছিলেন এপিক টেকনোলজিসের কর্ণধার ওয়াসিম আহমেদ।
তিনি দাবি করেন বাংলাদেশে চাহিদার ৩৫ শতাংশ রিং আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, বাকি ৬৫ শতাংশের যোগান দেয় অন্যান্য দেশ। আর তাদের অভিযোগ বাংলাদেশে আমেরিকান রিংয়ের নামে যেগুলো পাওয়া এসবই আসলে আমেরিকার বাইরেই তৈরি করা হয়। এখন তড়িঘড়ি করে সরকারের দাম নির্ধারণ করে দেয়া তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলবে বলে মি আহমেদ মনে করছেন। ১২ তারিখে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৬ তারিখে জানিয়ে দিল। এখন আমাদের হাতে এরইমধ্যে অনেক প্রডাক্ট, এত লস মানা আমাদের জন্য কঠিন, বলছিলেন ওয়াসিম আহমেদ। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাথে দ্রুত আলোচনায় বসতে চান তারা। তাদের দাবি ভারতের দামের সাথে মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ও ইউরোপের রিংয়ের একই রকম মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হোক।
হিডেন কস্টঃ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে কথা বলে জানা যায় বাংলাদেশে রিংয়ের দাম বেশি হওয়ার পেছনে বেশ কিছু ‘হিডেন কস্ট’ আছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট ইমপোর্টাস অ্যান্ড সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের কনভেনার আরশেদ আলম প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে রিংয়ের দাম বেশি হওয়ার পেছনে তিনটি কারণ তুলে আনেন। বাংলাদেশে ডিউটি অনেক, এত ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে এনে কত প্রফিট করবো? তিনি বলেন, ভারতে কিন্তু এত ডিউটি নেই, এটা একটা বিষয়। আবার সেখানে চাহিদাও অনেক, একটা কোম্পানি হয়তো সেখানে বছরে কয়েক লাখ প্রডাক্ট আনছে, কিন্তু আমাদের দেশে বছরে হাজার পিসও লাগছে না। ফলে প্রাইসও আলাদা। আর আরেকটা আছে ডাক্তারদের পেছনে খরচ।
মূল্য বৃদ্ধির এই তৃতীয় কারণটা নিয়ে বেশ বিতর্ক দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, কার্ডিওলজিস্টরা প্রায় প্রতি মাসে বিদেশ ভ্রমণ যাচ্ছে, এটা কীভাবে সম্ভব? দরকার নেই তাও কনফারেন্সে যাচ্ছেন। যে কোম্পানি যে ডাক্তারকে যে ভাবে খুশি করে সেইটা আসলে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তবে হারুণ উর রশীদ মনে করেন ডাক্তারদের বিদেশ যাওয়ার দরকার আছে। আর এইটার স্পন্সরশিপ খরচ তাদের দামের মধ্যেই ধরা থাকে। আমরা চাই তারা আরও বেশি বিশেষজ্ঞ হোক, সারা বিশ্বে নতুন নতুন প্রোগ্রাম হচ্ছে, প্রযুক্তি আসছে, কনফারেন্সে গিয়ে ডাক্তাররা এগুলো জানতে পারেন, বলেন তিনি। বরং সরকার ও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ যে ভ্যাট-ট্যাক্স কাটে, সেটা নিয়ে আপত্তি তার। এই বিভিন্ন রকম হিডেন কস্ট বা লুকানো খরচ বন্ধ করতে পারলে দাম এমনিতেই কমে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে হার্টের রিং-এর দাম ভারতের তিন গুণঃ * দাম নির্ধারণে বৈষম্যের অভিযোগ আমদানিকারকদের * হাসপাতালে সরবরাহ বন্ধ, দাম পুনর্বিবেচনার দাবি * তিন কম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ * ২৪ কম্পানির ক্ষেত্রে নীতিমালা মানা হয়নি * লাভ ধরে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে : ঔষধ প্রশাসন দেশে হৃদরোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সবচেয়ে আধুনিক স্টেন্টের (হার্টের রিং) সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। এই একই কম্পানির একই মানের স্টেন্টের দাম ভারতে ৩৮ হাজার ২৬৫ রুপি বা ৫০ হাজার ৮৯২ টাকা।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশে স্টেন্টের এই দাম ঠিক করে। আর ভারতের জাতীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ গত ৩১ মার্চ তাদের দেশে স্টেন্টের দাম ঠিক করে দেয়। দুই দেশের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রায় সব মানের স্টেন্টের দাম বাংলাদেশে ভারতের চেয়ে সর্বোচ্চ তিন গুণ বেশি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দেশে ২৭টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য স্টেন্টের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করেছে। অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে জাতীয় নীতিমালা বা মার্কআপ ফর্মুলা অনুসরণ করা হয়েছে মাত্র তিন প্রতিষ্ঠানের বেলায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই তিন প্রতিষ্ঠানের একই মানের স্টেন্টের মূল্য দাঁড়িয়েছে ভারতের প্রায় তিন গুণ।
আমদানিকারক বাকি ২৪ প্রতিষ্ঠানের স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে মার্কআপ ফর্মুলা মানা হয়নি। তার পরও যে দাম ঠিক করে দেওয়া হয়েছে তা ভারতে চলমান দামের চেয়ে সর্বনিম্ন তিন হাজার টাকা থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি। কিন্তু ভারতের তৈরি দুটি ব্র্যান্ডের স্টেন্টের দাম ধরা হয়েছে ভারতে যে দামে বিক্রি হয় তার চেয়ে ১১ হাজার টাকা কম। আবার বাংলাদেশে আয়ারল্যান্ডের তৈরি যে দুটি ব্র্যান্ডের স্টেন্ট সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় সেগুলোর একটির দাম ভারতের দ্বিগুণ, অন্যটির তিন গুণ বেশি। যেমন—আয়ারল্যান্ডের অ্যাবোট ভাসকুলার কম্পানির তৈরি জিয়েন্স প্রাইম ব্র্যান্ডের একটি স্টেন্টের দাম ভারতে বাংলাদেশি টাকায় ২৯ হাজার ৯২৫ টাকা। বাংলাদেশে দাম ঠিক করে দেওয়া হয়েছে ৬৬ হাজার ৫০০ টাকা। একই দেশের বোস্টন সায়েন্টিফিকের তৈরি প্রোমুস এলিট ব্র্যান্ডের স্টেন্টের দাম বাংলাদেশে ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা। ভারতে সেটির দাম ২৯ হাজার ৯২৫ টাকা।
এই দামে সন্তুষ্ট নয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল ডিভাইস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। তারা দাম পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে এবং গতকাল শনিবার থেকে হাসপাতালগুলো তাদের সরবরাহ করা স্টেন্ট ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছে। জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, রোগীদের কথা চিন্তা করে আগে সরবরাহ করা স্টেন্ট ব্যবহার যাতে বন্ধ না করা হয় তা বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে ঔষধ প্রশাসনের সঙ্গে বসে সমস্যার সমাধান করা উচিত। তা না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রোগীরা। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মুখপাত্র উপপরিচালক নুরুল আলম বলেন, হার্টের রিং নিয়ে নৈরাজ্য কমাতে সরকার মূল্য নির্ধারণ করেছে। ঔষধ প্রশাসন একা এই মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। এর জন্য ১৩ সদস্যের মূল্য নির্ধারণী কমিটি রয়েছে। তারা নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণ করেছে। এই দামের মধ্যে সরবরাহকারীর ট্যাক্স ও লাভ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য ১১.৫ শতাংশ খুচরা কমিশন রাখা হয়েছে। ভারত কিভাবে একই মানের স্টেন্টের দাম এত কম নির্ধারণ করেছে, জানতে চাইলে নুরুল আলম বলেন, ভারতে স্টেন্টের বিক্রি বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ফলে প্রস্তুতকারক কম্পানিগুলো সেখানে কিছু সুবিধা দেয়, যা বাংলাদেশ পায় না।
পাঁচ হাসপাতালে স্টেন্ট সরবরাহ বন্ধের চিঠিঃ দেশে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল ডিভাইস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন পাঁচটি হাসপাতালে স্টেন্ট সরবরাহ বন্ধের চিঠি দিয়েছে। তাদের দাবি, স্টেন্টের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়েছে। স্টেন্ট সরবরাহ বন্ধের চিঠি পাওয়া হাসপাতালগুলো হলো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন। এই পাঁচটি হাসপাতালেই মূলত হৃদরোগের চিকিৎসা বেশি হয়। এই হাসপাতাল গুলোকে গতকাল থেকে তাদের আগে সরবরাহ করে রাখা স্টেন্ট ব্যবহার না করার অনুরোধ করা হয়েছে। সংগঠনটির একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ঔষধ প্রশাসন স্টেন্টের বাজার তিনটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। ২৪টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জাতীয় নীতিমালা বা মার্কআপ ফর্মুলা অনুসরণ না করা এবং কেনা মূল্যের চেয়ে কম মূল্য নির্ধারণ এর প্রমাণ।
সংগঠনটিরই একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জাতীয় নীতিমালা বা মার্কআপ ফর্মুলা অনুসরণ করা হলেও বাজারে সর্বাধুনিক স্টেন্টের মূল্য কোনোভাবেই ৭০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। এখন ধরা হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। শুধু সিন্ডিকেটের কারণে দাম এত বেশি ধরা হয়েছে। জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মুখপাত্র নুরুল আলম বলেন, ইউরোপীয়ান কম্পানির স্টেন্ট আমদানিকারকরা বলছেন তাঁদের লোকসান হবে। এই তথ্য সঠিক নয়। কারণ লাভ ধরেই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নুরুল আলম বলেন, সর্বশেষ বৈঠকে ইউরোপীয় কম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই দাম নির্ধারণ করা হয়। সমস্যা থাকলে বৈঠকেই তাঁরা আলোচনা করতে পারতেন। আবার এখনো আলোচনার সুযোগ আছে। কিন্তু হঠাৎ করে স্টেন্ট সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁদের উচিত হয়নি।
যে তিন প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হলোঃ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যে ২৭ প্রতিষ্ঠানের স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণ করেছে এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাবোট ভাসকুলার, বোস্টন সায়েন্টিফিক ও মেডট্রোনিক নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিটি এক লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা করে। ইউরোপের ব্র্যান্ডের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় আয়ারল্যান্ডের অ্যাবোট ভাসকুলার, বোস্টন সায়েন্টিফিকের তৈরি জিয়েন্স প্রাইম এবং প্রোমুস এলিট ব্র্যান্ডের স্টেন্ট। এগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৬৬ হাজার ৫০০ ও ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা। আবার সুইজারল্যান্ডের বায়োসেন্সর ইন্টারভেনশনালের স্টেন্টের দাম ধরা হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা। একই দেশের বায়োটিক এজির স্টেন্টের দাম ৫৮ হাজার টাকা। জার্মানির ট্রান্সলুমিনা জিএমবিএইচ কম্পানির স্টেন্টের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ হাজার টাকা। যে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশে সেগুলোর সরবরাহকারী কারা? অ্যাবোট ভাসকুলার কম্পানির মেডিক্যাল ডিভাইস আমদানি করে কাডিয়ার্ক কেয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ। বোস্টন সায়েন্টিফিকের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভাসটেক লিমিটেড। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশে মেডিক্যাল ডিভাইস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন। মেডট্রোনিকের ডিলার মেডট্রোনিক বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহাবুবুর রহমান ডালিম। অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৭ সালের আগে মেডিক্যাল ডিভাইস বিক্রির গাইডলাইন ছিল না। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নীতিমালা অনুযায়ী সরকার ১.৪২ শতাংশ মার্কআপ ফর্মুলা করে এবং প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি কম্পানিকে প্রস্তাব দেয় মার্কআপ ফর্মুলা অনুযায়ী রিংয়ের মূল্য নির্ধারণের জন্য। কিন্তু বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলা অনুসারে কেন করা হলো না, এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন ভালো বলতে পারবে।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে খরচ কেমন ?
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য বেশি ব্যবহৃত হয় স্টেন্টের পুরনো সংস্করণ। এগুলোর দাম ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। আবার একই স্টেন্ট বেসরকারি হাসপাতালে বিক্রি করা হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকায়। স্টেন্ট ব্যবহারের প্রয়োজনীতা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মহসীন হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, সব রোগীর ক্ষেত্রে স্টেন্ট ব্যবহার করার দরকার হয় না। বেশির ভাগ রোগীকে ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। ওষুধের খরচ প্রতি মাসে গড়ে তিন হাজার টাকার বেশি হয়ে থাকে। আর যেসব রোগীকে স্টেন্টিং (রিং ব্যবহার) করানো হয় তারা তুলনামূলক ভালো থাকে। তবে তাদের ক্ষেত্রেও মাসে তিন হাজার টাকা ওষুধের পেছনে খরচ করতে হয়।