admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২১ ৯:০৮ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে করোনা মহামারীর সময় যেভাবে কাটছে সিএনজি চালকদের জীবন। এক সাক্ষাৎকারে জানাজায় মোহাম্মদ হাদিস উদ্দিন ঢাকায় ভাড়ায় গাড়ি চালাচ্ছেন ১৯৯১ সাল থেকে। বেবি ট্যাক্সি দিয়ে তার পেশাজীবন শুরু হয়েছিল, এখন অনেক বছর ধরে সিএনজি চালাচ্ছেন। তিনি বলছিলেন, করোনাভাইরাসের কারণে তিনি এখন যে ধরনের সমস্যায় পড়েছেন, তার ৩০ বছরের পেশাজীবনে এরকম সমস্যায় পড়েননি। প্রতিদিন গাড়ী বের করার পর অনেক জায়গায় ঘুরলে একটা ভাড়া মেলে। তাও যাত্রীরা ২০০ টাকার ভাড়া বলেন ১০০ টাকা। তাকে না দিলে দেখা যাবে, এই ১০০ টাকাও পেলাম না, তিনি বলেন।
সারাদিন গাড়ী চালিয়ে দেখা যায়, জমার টাকাই (প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা) ঠিক মতো ওঠে না। কোনদিন ঘরে ২০০, কোনদিন ১০০ টাকা নিয়ে যেতে পারি। লকডাউন আর রোজগার এবারের লকডাউনে একটানা ১৪ দিন তিনি ঘরে বসে ছিলেন। সেই সময় তার কোন আয়-রোজগার ছিল না। গত বছর একটানা দুইমাস তাকে ঘরে বসে কাটাতে হয়েছে। সেইবার সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলেও এবার কোন সাহায্যই পাননি। তার কাছে জানতে চাইলাম, তিনি কখনো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিনা? মি. হাদিস উদ্দিন দাবী করছেন, তিনি কখনোই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। যদিও তিনি কখনো এজন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেন নি।
এক কক্ষের এই বাসায় মোঃ হাদিসউদ্দিনে ছয় সদস্যের পরিবারের বসবাস তবে গত বছর তার ঠাণ্ডা লেগেছিল, কয়েকদিন পরেই ঠিক হয়ে যায়। ভালো হয়ে যাওয়ায় তিনি পরীক্ষা করানোর দরকার বোধ করেননি। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংকট শুরু হওয়ার শ্রমজীবী অনেক মানুষের নানারকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, অনেকের আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এরকম সংকটে পড়েছেন ঢাকার কয়েক হাজার সিএনজি চালক, যাদের একদিকে দিনের পর দিন যেমন বসে থাকতে হয়েছে, তেমনি ছোঁয়াচে এই রোগের কারণে যাত্রী পরিবহনও অনেক কমে গেছে। আবার নানা শ্রেণী পেশার যাত্রী বহন করতে গিয়ে নিজেদেরও ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
দেশে করোনা বলে কিছু নাই আগের সিএনজি চালানোর সঙ্গে বর্তমান সময়ের পার্থক্য করতে গিয়ে হাদিস উদ্দিন বলছেন, ”এখন অনেকে সচেতন হয়েছে, মাস্ক পড়েন, স্যানিটাইজার ব্যবহার করেন। আবার অনেকের ভাব দেখে মনে হয়, দেশে করোনা বলে কিছু নাই। তিনি নিজেও ভয়ে থাকেন, কোন ভাবে নিজে সংক্রমিত হয়ে পড়েন কিনা, যা তার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। খিলগাঁয়ে মি.হাদিস উদ্দিনের সিএনজি গ্যারেজ, সেখানে গিয়ে তার মতো অনেক চালকের সঙ্গে দেখা হল। তাদের সবার গল্প অনেকটা একই রকম।
সংকটে পড়েছেন ঢাকার কয়েক হাজার সিএনজি চালক, যাদের একদিকে দিনের পর দিন যেমন বসে থাকতে হয়েছে, তেমনি ছোঁয়াচে এই রোগের কারণে যাত্রী পরিবহনও অনেক কমে গেছে। গ্যারেজে অনেক সিএনজি এখনো পড়ে রয়েছে, চালক নেই।
এখানকার পরিচালক রিফায়েতউল্লাহ বলছেন,শুধু চালক নয়, ক্ষতির মুখে পড়েছেন মালিকরাও। করোনা যেই সময় বেশি আছিল, আমাদের রিক্সা নিয়াও গাড়ী ছাড়তে হয়েছে। কারণ ড্রাইভিং না খেয়ে থাকে, বাজার করতে পারছে না। রাস্তায় সার্জেন্ট মামলা করে। তারপরেও আমরা গাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। তিনি জানান, তাদের ৫২ টি সিএনজির অর্ধেকের বেশি এখন পড়ে থাকে। কারণ চালক নেই, অনেকে দেশে গিয়ে আর আসেনি।
এখান থেকে মি. হাদিস উদ্দিনের সঙ্গে তার বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম। গ্যারেজ থেকে বাসা বেশি দূরে নয়। সংসার চালানো কঠিন দক্ষিণ গোঁড়ানের একটি টিন শেড একতলা ভবনের একটি কক্ষে মোঃ হাদিস উদ্দিন বসবাস। এই একটি রুমেই তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে, এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন। তার স্ত্রী মোসাম্মাৎ রহিমা বলছেন, করোনাভাইরাস সংকট শুরু হওয়ার পর তার জন্য সংসার চালানো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘তাকে (হাদিস উদ্দিন) নিয়ে অনেক চিন্তা করতে হয়। উনি বাইরে যায়, করোনাভাইরাসের ডর। আগের চেয়ে ইনকাম কম হয়। আগে ভালো টাকা কামাইছে, এখন টাকা পয়সা কামাইতে পারতেছেন না। এখন অনেক কঠিন হয়ে গেছে সংসার চালানো। সারাক্ষণ এই ভয়ে থাকি, তিনি কি রুগী লইলেন কিনা, আক্রান্ত হইলেন কিনা, বলছিলেন মিসেস রহিমা। মোঃ হাদিস উদ্দিন বলছেন, প্রতিদিনের আয়ের ওপরেই তাদের জীবিকা নির্ভর করতে হয়। ফলে নিজে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও তাদের প্রতিদিন কাজে বের হতে হয়। কিন্তু ছোঁয়াচে এই রোগের কারণে যাত্রী সংখ্যা অনেক কমে গেছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একজন যাত্রী মেলে।