admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২০ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংক কর্মীদের খরচ কমাতে বেতন কাটছে, ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা। ব্যাংকগুলোর আয় কমে যাওয়ায় তাদের খরচ কমানোর কথা ভাবতে হচ্ছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যখন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক পরিবার, তখন বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি ব্যাংক তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাটতে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলো বলছে, আগে থেকেই খেলাপি ঋণের চাপ, তারল্য সংকট, তার ওপর ব্যবসা বাণিজ্যের অবনতির কারণে করোনাভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবে তাদের ব্যবসা খাদের কিনারে এবং ব্যায় কমানো ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই, বেতন না কমালে ছাঁটাই করতে হবে।
সরকারি, বেসরকারি, বিদেশি প্রতিটি ব্যাংকের আয় প্রায় ৬৬% পর্যন্ত কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সামনে এখন একটাই পথ, আর সেটা হল খরচ কমানো। কয়েকটি ব্যাংক তাই খরচ কমাতে কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছাঁটাই করার পরিবর্তে তাদের বেতন কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সামনের জুলাই মাস বেতন কাটার এই সিদ্ধান্ত কার্যকরের কথা রয়েছে। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে ওই ব্যাংকগুলোর কর্মচারীরা ক্ষুব্ধ হলেও চাকরি টিঁকিয়ে রাখতে প্রতিবাদ করতে পারছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে জানান, এই বেতন কাটার কারণে তার পুরো জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আমার বাবা করোনাভাইরাসে মারা গেছেন। পরিবারের পুরো দায়িত্ব এখন আমার ওপর। এরমধ্যে বেতনও কমে যাচ্ছে। এখন আমাদের থাকা, খাওয়া সীমিত করে আনা ছাড়া উপায় নেই। কিছু বলতেও চাই না। কারণ চাকরিটা অন্তত থাকুক। তার মতো এমন বেতন কাটার ভোগান্তির কথা আরও কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা স্বীকার করলেও প্রতিষ্ঠান থেকে কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা অন-রেকর্ড কিছু বলতে চাননি।
ব্যাংকগুলো কিভাবে খরচ কমাচ্ছেঃ ব্যাংকগুলোর ব্যয়ের অন্যতম বড় খাত হচ্ছে পরিচালন ব্যয়, আর পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন। এই বেতনে ব্যাংকের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকায় সিটি ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক এরিমধ্যে কর্মীদের বেতন কাটার ঘোষণা দিয়েছে। কোন কোন ব্যাংক ঢালাওভাবে সব কর্মীদের বেতন ৫%-৬% পর্যন্ত কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার কিছু ব্যাংক তাদের যেসব কর্মীদের বেতন ৩০ হাজার বা ৪০ হাজার টাকার ওপরে তাদের বেতনের ১০% থেকে ২৫% পর্যন্ত কাটবে বলে জানিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) কর্মীদের বেতন কাটাসহ ১৩ দফা সুপারিশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান বরাবর পাঠায়। ওইসব সুপারিশের মধ্যে ব্যাংক কর্মীদের পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট, ইনসেন্টিভ বোনাস, নতুন নিয়োগ, নতুন শাখা খোলা, বিদেশ ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সুপারিশ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে বিএবি।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের কারণে এখন নতুন কোনও ব্যবসা নেই। অন্যদিকে সব ঋণের সুদহার ৯% শতাংশে নামিয়ে আনায় আয় কমে গেছে। ব্যয় বেড়ে ৬৬% শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় ব্যাংক বাঁচাতে ব্যয় কমানো ছাড়া উপায় নেই। এক্ষেত্রে তিনি কর্মীদের চাকরি থেকে ছাঁটাই না করে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানান।
সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকের ওপর চাপ বাড়লেও তাদের বেতন কমানোর সুপারিশ আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংগঠনগুলো কী বলছে কর্মীদের বেতন কাটার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও সরাসরি কোন নির্দেশনা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয় ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীরা যেন প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে সে লক্ষ্যে তাদের উজ্জীবিত রাখতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ ব্যাংকগুলোকে গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, এমন কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না যার কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেসব ব্যাংক বেতন কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে ওই ব্যাংকেরই সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তাদের বিকল্প উপায়ে খরচ কমানো যায় কিনা ভেবে দেখা জরুরি। ব্যাংকগুলোর সাথে কোন আলোচনা ছাড়া হঠাৎ বেতন-ভাতা কাটার এমন সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মনে করছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স অব বাংলাদেশ-এবিবি এর সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তার মতে, মানুষের বেতনে হাত না দিয়ে ব্যাংকের অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কমানো প্রয়োজন। এরমধ্যে রয়েছে ব্যাংকগুলোর ফ্লোর ভাড়া, অপ্রয়োজনীয় এটিএম বুথের ভাড়া, পরিবহন বিল, বিদ্যুৎ বিল, আপ্যায়ন ব্যয়, ষ্টেশনারীর মতো অন্যান্য খরচ। এছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকিং এর আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। মি রহমান বলেন, করোনার এই দুর্যোগের সময়ে আমাদের ব্যাংক কর্মকর্তারাই অর্থ সঞ্চালনের এই খাতকে গতিশীল রেখেছে। এমন একটা সময়ে তাদের বেতন কেটে নেয়াটা কোন যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে। খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দেশের এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে কর্মীদের বেতন না কেটে খেলাপি ঋণ আদায়ের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন। অনেক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি। এর পাশাপাশি অন্যান্য যে ব্যয়গুলো আছে সেদিকে ফোকাস না করে শুধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন কমালে প্রতিষ্ঠানের কোন লাভ হবে না। যদি বেতন কমাতেই হয় তাহলে উচ্চ পদের কর্মকর্তাদের আংশিক বেতন সাময়িক সময়ের জন্য কমিয়ে আনা যেতে পারে বলে তিনি জানান। তবে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংক এখনই তাদের কর্মীদের বেতন কাটবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।বাংলাদেশে সরকারি, বেসরকারি, বিদেশি মিলিয়ে মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬২টি, আর এগুলোর মধ্যে বেসরকারি ব্যাংক ৪২টি। আর এসব বেসরকারি ব্যাংকে মোট কর্মীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ১০ হাজার। এই বিপুল পরিমাণ কর্মীর আয় সংকোচন হলে তার প্রভাব সার্বিক অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।