admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২১ ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশী বাবা বনাম জাপানি মায়ের আইনি লড়াই দুই শিশু কন্যাকে সিআইডির জিম্মায় রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ। জাপানি একজন নারী তার দুই কন্যা সন্তানকে নিজের জিম্মায় নিতে বাংলাদেশের হাইকোর্টে যে রিট করেছিলেন, তার শুনানি শেষে ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত শিশু দুটিকে সিআইডির ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে’ রাখার আদেশ দিয়েছে আদালত। রিট আবেদনকারী আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছেন, সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত শিশুদের মা এবং বিকেল তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তাদের বাবা সেখানে অবস্থান করে তাদের দেখভাল করবেন, এমন আদেশ দেয়া হয়েছে।
শিশু দুটিকে তাদের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বাবার কাছ থেকে নিজের জিম্মায় পেতে ঢাকায় এসে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন এই জাপানি নারী। তাদের বাবা ১০ ও ১১ বছর বয়সী দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে মায়ের সম্মতি ব্যতীত বাংলাদেশে চলে এসেছেন এমন অভিযোগ তুলে শিশুদের নিজের জিম্মায় নিতে আদালতে রিট করেন জাপানি এই নারী। তার আইনজীবী জাপানি দূতাবাসের কাছে শিশু দুটিকে হস্তান্তর করার জন্য আদালতের কাছে আজ অনুরোধ করেন।
সন্তান ফিরে পেতে টোকিও থেকে ঢাকাঃ পেশায় চিকিৎসক একজন জাপানি মা বাংলাদেশে এসে দুই কন্যা সন্তানকে নিজের জিম্মায় পেতে হাইকোর্টে রিট করেছেন, গত সপ্তাহ থেকে এই খবরটি নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। রিট আবেদনে বলা হয়েছে, টোকিও থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে আসেন তিনি। টোকিওর একটি জেব্রা ক্রসিং। ১২ বছর ধরে টোকিওতে বসবাসের পর এই দম্পতি এখন বিয়ে বিচ্ছেদ এবং সন্তানের অধিকার নিয়ে মামলা লড়ছেন।
জাপানি এই নারীর আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছেন, তার স্বামী, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন মার্কিন নাগরিক। ১২ বছর ধরে বিবাহিত এই দম্পতি টোকিওতে বসবাস করতেন। তাদের তিন কন্যা শিশু রয়েছে। তবে এবছরের জানুয়ারি মাসে জাপানের আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন তাদের শিশুদের বাবা। বাবার পক্ষের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, “বিয়ের সময় ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন জাপানি নারী। তার স্বামী চাচ্ছিলেন সন্তানদের মুসলিম রীতিতে বড় করতে। সেটি নিয়ে তাদের মধ্যে বিবাদ দেখা দেয়। সম্ভবত এই কারণেই বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন।”
সন্তানদের নিজের জিম্মায় পেতে জাপানেও আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন তাদের মা। রিটে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, টোকিওতে স্কুল বাসে করে বাড়ি ফেরার পথে তিন কন্যার মধ্যে বড় দুইজনকে তার অগোচরে অন্য কোথাও নিয়ে যান তাদের বাবা। রিটে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি মেয়েদের জন্য পাসপোর্ট করিয়েছেন এবং এরপর ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে চলে আসেন। যদিও ফাউজিয়া করিম বলেছেন, শিশুদের বাংলাদেশি এবং মার্কিন এই দুই ধরনের পাসপোর্ট রয়েছে এবং বাংলাদেশে আসার পর এখানে পারিবারিক আদালতে বাচ্চাদের জিম্মায় পেতে তাদের বাবাও মামলা করেছেন।
তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মে মাসে জাপানের একটি পারিবারিক আদালত মায়ের অনুকূলে রায় দিয়ে দুই কন্যা সন্তানকে তার কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেয়। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে টোকিও থেকে এতদিন বাংলাদেশে আসতে পারেননি তাদের মা। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের একজন আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করেন তিনি এবং অবশেষে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ঢাকায় এসেছেন মেয়েদের নিয়ে যেতে।
১৯ অগাস্ট বাংলাদেশের আদালতে রিট আবেদন করেন জাপানিজ চিকিৎসক। রিট আবেদনে তিনি অভিযোগ করেছেন যে তিনি ঢাকা এসে পৌঁছানোর পর মায়ের সাথে দুই মেয়েকে সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয় ঠিকই, কিন্তু সে সময় তার মোবাইল ফোন বন্ধ করে , চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে একটি গাড়িতে করে অজ্ঞাত কোন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেভাবেই পাঁচ মাস পর কন্যা সন্তানদের সাক্ষাত পান তিনি। সন্তানদের অবস্থান জানাতে অস্বীকৃতি এবং তাদের সাথে দেখা করতে না দেয়া এমন অভিযোগ তুলে ১৯ অগাস্ট রিট আবেদন করেন তিনি। রিটের শুনানিতে বাবা ও তার বোনকে ৩১ অগাস্ট শিশু দুটিসহ আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছিল।
শিশু দুটিকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া নিয়ে প্রশ্নঃ গত রাতে মেয়ে দুটিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্ধার করেছে, এমন তথ্য দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। শিশু দুটিকে ৩১ অগাস্ট হাইকোর্টে হাজির করার ব্যাপারে আদালতের যে আদেশ ছিল, সেটি করার আগেই সিআইডি কেন মেয়ে দুটিকে তাদের হেফাজতে নিয়েছে তা নিয়ে বাবা ও মা দুই পক্ষের দুই আইনজীবীই আজ প্রশ্ন তুলেছেন। গতরাতে মেয়ে দুটিকে তাদের বাবা ও ফুপুসহ ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে’ নিয়ে যাওয়া হয়। আজ সকালে আদালতের কাছে এ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাবার পক্ষের আইনজীবী ফাউজিয়া করিম।
তিনি অভিযোগ করেছেন যে, মধ্যরাতে কোন কাগজপত্র ছাড়া ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ এসে জোরপূর্বক তাদের নিয়ে যায়। এটাকে জোরপূর্বকই বলতে হবে। আমার টিমের একজন আইনজীবী অনেক রাত পর্যন্ত তাদের সাথে ছিল। দুপুর দুইটার দিকে বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের আদালতে হাজির করার সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এরপরই আদালত তাদের সাতদিনের জন্য সিআইডির জিম্মায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখার আদেশ দেয়।
সিআইডি যা বলেছেঃ ৩১ শে অগাস্ট শিশু দুটি, তাদের বাবা এবং ফুপু যাতে আদালতে হাজির হন সেটি নিশ্চিত করার জন্য সিআইডিকে বলা হয়েছিল। এই চারজন যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য তাদের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ছিল। রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার আজ আদালতে বলেছেন যে, বাবার ঠিকানা এবং ফোন নম্বরে পরিবর্তন হয়েছে বলে সিআইডি জানতে পারে। এক পর্যায়ে সন্দেহের ভিত্তিতে চারজনকে গতরাতে তাদের বাড়ি থেকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নেয়া হয়।