admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৮ জুন, ২০২২ ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
মুক্ত কলম নিউজ ডেক্সঃ ভারতে নবী করিম (সাঃ) নিয়ে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিতর্কিত মন্তব্য দেশটির জন্য এক কূটনৈতিক দুঃস্বপ্ন তৈরি করেছে। দিন দশেক আগে টেলিভিশনের এক বিতর্ক অনুষ্ঠানে নূপুর শর্মার মন্তব্য ভারতে এবং ভারতের বাইরে বারোটির বেশি মুসলিম দেশে মুসলমানদের চরম ক্ষুব্ধ করেছে।

ভারতীয় পন্য বর্জন চলছে।
রবিবার বিজেপি মিজ শর্মাকে দল থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। মিজ শর্মার টিভি অনুষ্ঠানে করা ওই আপত্তিকর মন্তব্যের স্ক্রিনশট টুইটারে শেয়ার করার জন্য দল দিল্লিতে তাদের মিডিয়া শাখার প্রধান নাভিন কুমার জিন্দালকেও দল থেকে বহিষ্কার করেছে। এক বিবৃতিতে বিজেপি বলেছে, তাদের দল কোন সম্প্রদায় বা ধর্মকে হেয় করে বা অপমান করে এমন কোন আদর্শের বিরুদ্ধে এবং তারা আরও বলেছে যে তারা এ ধরনের দর্শন বা ব্যক্তিকে সমর্থনও করে না।
মুসলিম দেশগুলোর ক্ষোভ প্রশমন করার চেষ্টায় ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, এসব মন্তব্য সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না এবং এগুলো পার্টির ভেতরকার কোন ব্যক্তির মতামত নয়। কিন্তু অনেকেই যেটা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন সেটা হল – মিজ নূপুর শর্মা পার্টির বাইরের কেউ নন, তিনি রীতিমত দলের ভেতরকার গুরুত্বপূর্ণ একটা কণ্ঠ। এতে সারা বিশ্বে মুসলিম দেশ গুলো ফুসে উঠেছে হুজুর পাক (সাঃ)কে নিয়ে অবমাননাকর কথা বলায় মুসলিম রাস্ট্রগুলো ভারতীয় পন্য বর্জন শুরু করেছে। এতে ভারতে অর্থনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব পড়তে যাচ্ছিচ। এই ধকল ভারত সামলাতে পারবে কি?

ভারত এই ঠেলা সামলাতে দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার হওয়ার আগে পর্যন্ত ৩৭ বছর বয়সী এই আইনজীবী ছিলেন বিজেপির সরকারি মুখপাত্র, যিনি ছিলেন দলের উঠতি এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন মুখপাত্র, যিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে এবং সরকারের পক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেবার জন্য রাতের পর রাত টেলিভিশনের বিতর্ক অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময় মিজ শর্মা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন ২০০৮ সালে। তখন তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ আন্দোলনের ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-এর ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হবার মাধ্যমে রাজনীতিতে ঢোকেন।
শিরশ্ছেদ করার হুমকিঃ সাংবাদিক এবং তথ্য-যাচাইকারী মোহাম্মদ জুবায়ের মিজ শর্মার ওই অবমাননাকর মন্তব্য যখন টুইটারে শেয়ার করেন, তখন নূপুর শর্মা দিল্লি পুলিশকে টুইট করে বলেন যে তাকে ধর্ষণ করার হুমকি দিয়ে অসংখ্য মেসেজ করা হচ্ছে; তাকে, তার বোন এবং মা ও বাবাকে হত্যা ও শিরশ্ছেদ করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। তিনি মি. জুবায়েরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে তিনি “মিথ্যা রটনা চালিয়ে পরিবেশ বিষাক্ত করছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছেন এবং আমার ও আমার পরিবারকে লক্ষ্য করে ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক আক্রমণ চালাচ্ছেন।
তার টুইটে তিনি ট্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির প্রেসিডেন্ট জেপি নাড্ডাকে। এর তিন দিন পর, তার প্রতি সহানুভূতিশীল একজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে তিনি বলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিস এবং পার্টি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সকলে তার পেছনে আছেন। কিন্তু গোলযোগের সূত্রপাত হয় গত শুক্রবার তেসরা জুন, যেদিন উত্তর প্রদেশের কানপুর শহরে তার মন্তব্যের বিরুদ্ধে মুসলিমদের একটি প্রতিবাদ বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। কট্টরপন্থী হিন্দু সাধু যোগী আদিত্যনাথ শাসিত রাজ্যের পুলিশ বিক্ষোভকারীদের কঠোর হাতে দমন করে। শত শত মুসলমানের বিরুদ্ধে তারা অভিযোগ দায়ের করে এবং বেশ কিছু মুসলিমকে ধরপাকড় করে। এরপর বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মিজ শর্মার বিবৃতির নিন্দা জানাতে শুরু করলে মিজ শর্মা ও বিজেপির পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক কথাবার্তা এবং আক্রমণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ভারতের এই অভ্যন্তরীণ বিষয় এখন যেরকম আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে, তাতে করে বিজেপির নেয়া এই পদক্ষেপ হয়তো যথেষ্ট নয়। কুয়েত, কাতার এবং ইরান এরই মধ্যে রবিবার ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের ডেকে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সৌদি আরবও সোমবার এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছে। কাতার বলেছে, তারা প্রত্যাশা করে ভারত যেন এবিষয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এধরণের ইসলাম বিদ্বেষী মন্তব্যের জন্য যদি কোন শাস্তি পেতে না হয়, যদি এটা অব্যাহত থাকে, তাহলে সেটি মানবাধিকারের জন্য এক গুরুতর হুমকি এবং এর ফলে হয়তো বিদ্বেষ আরও বাড়বে, সংঘাত এবং ঘৃণার একটা চক্র তৈরি হবে। সৌদি আরবও তাদের দেয়া বিবৃতিতে বেশ কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছে। বিজেপির মুখপাত্র যে মন্তব্য করেছেন সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার নিন্দা করছে।
সাতান্নটি মুসলিম দেশের জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (ওআইসি) এবং পাকিস্তানও ভারতের সমালোচনা করেছে। তবে দিল্লি আবার পাকিস্তান এবং ওআইসি- উভয়ের সমালোচনা করে বলেছে, “এ বিষয়ে তাদের মন্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সংকীর্ণ মনের। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত সরকার এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে হয়তো এ বিষয়ে একটি প্রকাশ্য বিবৃতি দিতে হতে পারে। তারা বলছেন, এটি না করলে হয়তো ভারতের সঙ্গে আরব বিশ্ব এবং ইরানের সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে।
আরব দেশগুলোও তাদের নিজ নিজ দেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ প্রশমনের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়ার উপায় খুঁজছে। এসব দেশে ভারতের সমালোচনা করা হ্যাশট্যাগ সোশ্যাল মিডিয়ায় খুবই আলোচিত হচ্ছে এবং অন্যান্য গণমাধ্যমেও এটি বড় খবর হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন কোন হ্যাশট্যাগে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হচ্ছে। কাতার এবং কুয়েতে কিছু কিছু দোকানপাট ভারতীয় পণ্য তাদের তাক থেকে সরিয়ে নিচ্ছে এমন খবরও আসছে। মি. কুগেলম্যান বলছেন, জিসিসি এবং ভারত – উভয়ের তরফ থেকেই তাদের সম্পর্ক বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং কিভাবে সম্পর্কের ক্ষতি করার ঝুঁকি এড়ানো যায়, সেটা নিয়ে হয়তো দুই তরফ থেকেই ভাবা হবে।
কৌশলগত ভাবে এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল থেকে এরকম ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার যদিও কারণ আছে, একই সঙ্গে ভারতের যে শক্তিশালী অবস্থান এবং প্রভাব, সেটাও তাকে কিছুটা রক্ষা করবে। নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থেই উপসাগরীয় দেশগুলোর ভারতকে দরকার, যেন ভারত তাদের জ্বালানী আমদানি অব্যাহত রাখে। তারা চায় ভারতীয়রা উপসাগরীয় দেশগুলোতে আসুক, কাজ করুক, বসবাস করুক। সব মিলিয়ে তাদের ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন চালিয়ে যাওয়া দরকার, বলছেন তিনি। মাইকেল কুগেলম্যান আরও বলেন, ভারতে মুসলিম বিরোধী মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এই দেশগুলো কতদূর পর্যন্ত যাবে, সেটারও হয়তো একটা সীমা আছে।
ভারতকে প্রকাশে মাপ চাইতে হবে। তানা হলে ভারতের ঝুলিতে পানি থাকবে না।