admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর, ২০২৪ ৩:৫৩ অপরাহ্ণ
সুবীর চক্রবর্তী ছোটন, দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ হাজারো ভক্ত পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গন। মন্দিরের চারিদিকে ভজন, কীর্তন আর ধর্মীয় সঙ্গীতের ধ্বনীতে অন্যরকম এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে ঐতিহাসিক এই মন্দির ঘিরে। শ্রী কৃষ্ণের রাসলীলা উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাতে পুর্ণিমা তিথিতে রাস উৎসবে দেশ-বিদেশ থেকে আগত এসব ভক্ত, পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী ভীড় জমায় প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীর নিদর্শন দিনাজপুরের ঐতিহাসিক কান্তজীউ মন্দির প্রাঙ্গনে। শুক্রবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কান্তজীউ মন্দির প্রাঙ্গনে আসতে শুরু করে ভক্ত, পুণ্যার্থী ও ভক্তরা।
সন্ধ্যা হতে না হতেই ভর্তি হয়ে যায় কান্তজিউ মন্দির ও এর আশপাশ এলাকা। রাত যতই গভীর হয় ততই ভীড় বাড়তে থাকে মানুষের। কেউ এসেছেন মনোবাসনা পুরনে, কেউ এসেছেন মনোবাসনা পুরনের পর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মন্দিরে প্রনাম করতে, কেউ এসেছেন ঐতিহাসিক এই মন্দির দর্শনে, আবার কেউ কেউ এসেছেন রাস উৎসব স্বচক্ষে অবলোকন করতে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা থেকে আগত ভক্ত নলনী কান্ত রায় জানালেন, তিনি প্রথম বারের মতো এসেছেন এই রাস উৎসবে। বহুদিন থেকে শুনেছেন ঐতিহাসিক এই মন্দিরে রাস উৎসব সম্পর্কে। কিন্তু আসা হয়নি। তাই শেষ বয়সে এসেছেন পরকালের শান্তি কামনায়। একই জেলার উজ্জল চন্দ্র দাস জানালেন, তিনি এ বছর ধরে চারবার আসলেন এই রাস উৎসবে। প্রথমবার আসার পর তিনি এখানে মানত করেছিলেন। তার সেই মনোবাসনা পুরন হয়েছে। তাই যতদিন বেচে থাকবেন ততদিন এই রাস উৎসবে আসার ইচ্ছা আছে তার।
রংপুর থেকে আসা রাধা রানী জানালেন, তিনি শুনেছেন-এখানে এসে কেউ কিছু চাইলে তা বিফলে যায়না। তাই তিনি এসেছেন মনোবাসনা পুরনে। ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তার ইচ্ছা পুরন করবেন এমন আশা তার। এ ধরনের অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন মনোবাসনা পুরন, কৃতজ্ঞতা আর দর্শনের ইচ্ছা নিয়ে। শুধু দিনাজপুর ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ভক্ত, পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা বাস, মাইক্রোবাস এবং অন্যান্য যানবাহনযোগে আসেন মন্দির প্রাঙ্গনে। পার্শ্ববর্তী ভারত ও আশেপাশের দেশ থেকেও এসেছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। উৎসবের আয়োজক দিনাজপুর রাজ দেবোত্তর এস্টেট-এর পক্ষে প্রেম নাথ রায় জানালেন, ৩’শ বছরেরও বেশী সময় ধরে চলে আসছে এই রাস উৎসব।
এদিকে রাসপুর্ণিমা উপলক্ষে কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গনে আয়োজন করা হয়েছে মাসব্যাপী রাস মেলার। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মাস ব্যাপী এই রাস মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলায় ধর্মীয় কীর্ত্তনগান ছাড়াও হিন্দু ধর্মীয় বই-পুস্তক, শাঁখা-সিদুর, শড়খ, বালা, চুড়িসহ নানান পণ্যের পসরা সমৃদ্ধ দোকান মেলায় শোভা পেয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে মন্দির প্রতিষ্ঠার পর হতে রাজ বংশের পরিবার প্রচলিত চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্ঠমীর আগের দিনে পূর্ণভবা নদীপথে নৌবহরে করে কান্তনগর মন্দিরে থাকা কান্তজিউ বিগ্রহ দিনাজপুরের রাজবাড়ী মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৩ মাস থাকার পর আবার কার্তিক মাসের পূর্ণিমা যেটাকে রাস পূর্ণিমা বলে, তার একদিন আগে ভক্ত- পূণ্যার্থীদের অংশগ্রহনে পায়ে হেটে কান্তজিউ বিগ্রহ পুনরায় কান্তনগর মন্দিরে নিয়ে আসা হয়।
রাস উৎসব উপলক্ষ্যে মন্দির প্রাঙ্গন ও আশেপাশে এক মাস ব্যাপী রাস মেলা অনুষ্ঠিত হয়। জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ রায় ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পরে ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে তারই পালকপুত্র রামনাথ রায় মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করেন। কান্তজিউ মন্দির বা কান্তনগর মন্দির নবরত্ন মন্দির নামেও পরিচিত। ১৮ শতকে নির্মিত এই মন্দিরটি ৩ তলা বিশিষ্ট ছিল এবং এর ৯টি চূড়া বা রত্ন ছিল। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পের ফলে চুড়াগুলো ভেঙ্গে যায়। পরবর্তীতে মন্দিরটির সংস্কার করা হলেও চুড়াগুলো আর যথাসম্ভব স্থানে স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।