admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১১ মে, ২০২০ ১:৪৬ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনাঃ অ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীন, একমাত্র মার্শাল ল বা সান্ধ্য আইন ছাড়া বাংলাদেশের মানুষকে ঘরে আটকে রাখা আসলেই কঠিন। শুধু বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর অনেক দেশে এমনকি আমেরিকার মতো দেশেও মানুষকে ঘরে রাখা যায়নি। তার মাসুল তাদের গুনতে হচ্ছে। দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী সভ্য দেশ আমেরিকা নাকানিচুবানি খাচ্ছে। এক্ষেত্রে সে দেশের প্রেসিডেন্টের অজ্ঞতাও কম দায়ী নয়। গায়ের জোড়ে দুনিয়ায় মোড়লগিরি করতে করতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট গণের একটা ধারনা জন্মে গিয়েছে ,তারা বিশ্বের সব কিছুরই নিয়ন্তা।
দফায় দফায় ছুটি বাড়িয়ে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত একটানা ছুটি, জরুরী সার্ভিস ব্যতিরেকে অফিস-আদালত, শিল্প-কলকারখানাসহ প্রায় সবকিছু বন্ধ থাকার পরও মানুষ বের হয়ে আসছে রাস্তায়। নিতান্ত প্রয়োজনে যেমন, ওষুধ বা খাদ্য কেনা অথবা জরুরী চিকিৎসা সেবার জন্য বাইরে আসা অপরিহার্য হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মানুষ একেবারে অকারণেও বের হয়ে আসছে রাস্তায়। আর শুধু একা নয়, অনেক ক্ষেত্রে দলে দলে-পায়ে হেঁটে অথবা অন্যবিধ উপায়ে। এ রকম প্রায় জনসমুদ্রতুল্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা গেছে ৪ এপ্রিল ছুটি শেষ ও প্রলম্বিত করার অবকাশে। তখন গার্মেন্টস শ্রমিকদের সবাইকে ঢাকায় আসতে কেউ বলেনি, তবু দলে দলে শ্রমিক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছুটে আসে রাজধানীতে। তারা অনেক কষ্টে ঢাকায় এসেছে কারণ তাদের ধারণা জন্মেছে যে কারখানায় কাজ করে অনুপস্থিতিজনীত কারণে তার চাকুরীটা চলে যেতে পারে।
এই দুর্যোগে চাকুরীটা হারানোর ঝুঁকি কেউ নিতে চায়নি। যদি এমন ব্যবস্থা করা যেতো চাকুরীতে আসুক আর না আসুক কমপক্ষে তার চাকুরী হারাবার ভয় থাকবেনা। যদিও সরকারের তরফ থেকে গার্মেন্টস মালিকগণকে অনুরোধ করা হয়েছে , সরকারের তরফ থেকে ঘোষণাও করা হয়েছে , কিন্তু গার্মেন্টস মালিকরাওতো আর সরকারের নির্দেশে চলেনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবার আগে গার্মেন্টস এর জন্য প্রনোদনা ঘোষণা করেছেন। এত বড় বড় গার্মেন্টস কারখানা , শতকোটি টাকার ব্যবসা , তারা তাদের কর্মচারীদের এক মাসের বেতন দেওয়ার ক্ষমতা রাখেনা এ কথা বিশ্বাস করা শক্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অনুধাবন করেছেন এবং এই সব শতকোটি টাকার ‘কাঙ্গাল’ মালিকদের জন্য প্রনোদনা ঘোষণা দিয়েছেন যাতে করেন শ্রমিকরা মজুরী পায়। দুঃখ জনকভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম কোন কোন গার্মেন্টস শ্রমিকদের রাস্তায় বিক্ষোভ করতে হলো তাদের বকেয়া বেতনের জন্য। গার্মেন্টস মালিকরা হয় বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর সদস্য। উভয় সংগঠন দেশের যাবতীয় গার্মেন্টস কারখানা নিয়ন্ত্রন করে। তার পরে কেন শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে করোনার ঝুঁকি বাড়াতে সুযোগ করে দেওয়া হলো তার জবাব অবশ্যই গার্মেন্টস মালিকদের দিতে হবে।
এতে করোনা সঙ্কটজনিত সমস্যা সমাধানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, নিরাপত্তা বিধান ও সঙ্গনিরোধ কার্যক্রম রীতিমতো হুমকির মুখে পড়ে। অতঃপর বাধ্য হয়ে সরকার ও প্রশাসন লকডাউন নিশ্চিত করতে করে কঠোর ব্যবস্থাগ্রহণ করে। রাজধানী ঢাকা , নারায়নগঞ্জ সহ অনেক জেলার অধিকাংশ এলাকা ইতোমধ্যে লকডাউন হয়েছে। নারায়নগঞ্জ শ্রমঘন এলাকা। ইতোমধ্যে প্রমান হয়েছে নারায়গঞ্জে সংক্রমন বেড়েছে। তারা সারাদেশের যেএলাকাতে গেছে সেই এলাকাতেই করোনার বিস্তার ঘটেছে। লকডাউন করতে হয়েছে প্রতি জেলায়। যে কোন মূল্যে মানুষের যাতায়াত ও চলাচল যথাসম্ভব সীমিত করতে হয়েছে।
এদিকে করোনা চিকিৎসায় সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। প্রথমত, করোনা নির্ণয়ের জন্য দেশে কোন কিট ও পিপিই-মাস্ক ইত্যাদি ছিল না। পরে গণস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পোশাক কারখানায় সেসব তৈরি হলেও হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে তা সরবরাহে কোন সমন্বয় নেই বললেই চলে। ফলে শুরুতে চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারী হাসপাতালগুলো করোনা সন্দেহে রোগী ভর্তিতেও অনীহা দেখিয়েছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির যথেষ্ঠ উন্নতি হচ্ছে।
অন্যদিকে করোনা সঙ্কটে সর্বাধিক বিপদ ও অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী এরমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে। অনেকে দেশে ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব। তবে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় ভবিষ্যত হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে বাংলাদেশীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চাপও রয়েছে সরকারের ওপর। এর পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তো আছেই। সব মিলিয়ে আগামী কয়েকদিন সবার জন্যই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও দুর্ভাবনার বৈকি।
করোনা ভাইরাসজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই সজাগ ও সচেতন থেকেছেন এবং তদনুযায়ী পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন সময়ে সময়ে। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে প্রধানমন্ত্রী কিছু প্যাকেজও ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ছয় মাস পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য ও আর্থিক প্রণোদনা দুর্গতদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়া, দশ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি, টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি ইত্যাদি। মাঠপর্যায়ে কাজটি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে ডিসি, ইউএনও অফিসকে। সরকারের একজন সচিবকে জেলার খাদ্য সহায়তাসহ সার্বিক বিষয় সমন্বয় করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সে ক্ষেত্রে আদৌ কোন দুর্নীতি-অনিয়ম সহ্য করা হবে না, বরং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশে কেউ অভুক্ত থাকবে না। খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে এবং যাবতীয় প্রণোদনা দেয়া হবে কৃষকদের। তবে এই সঙ্কটেও বাংলাদেশের যেটি আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে তা হলো, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। তরিতরকারি, শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস-দুধ-পোলট্রিতেও বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু মাত্র কাজ হলো শব্জী আবাদকারীদের বেঁচে থাকার বন্দোবস্ত করতে হবে। তাদের উৎপাদিত শব্জীর মুল্য যাতে তারা পায় সেই কায়দা খুজতে এবং কার্যকরী করতে হবে।
এর ফলে দেশে দুর্ভিক্ষ তো দূরের কথা, খাদ্য সঙ্কটেরও সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এখন দরকার নিয়মিত বাজার তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় প্রশাসন সেদিকে দৃষ্টি রাখছে প্রতিনিয়ত। প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই আত্মবিশ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে, যেটি সাহস ও শক্তি জোগাবে সাধারণ মানুষ ও কৃষককে। এ সময়ে সাধারণ মানুষেরও উচিত হবে ঘরে স্বেচ্ছাবন্দী তথা কোয়ারেন্টাইনে থাকা। মাননীয় প্রথধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে আহবান জানিয়েছেন দেশের এক ইঞ্চি জমি যেন পড়ে না থাকেব। যে কোন রকমের কৃষি আবাদ , ছাদ কৃষির উপর গুরুত্ব আরোপ করেনে। বিষয়টি দরুন ইতিবাচক। ইতোমেধ্যে এ বিষয়ে সারা পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। এবারে আবাদ ভালো হয়েছে। সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় সময় মতো হাওড়ের ধান ঘরে উঠেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভর্তূকীমুল্যে বিভিন্ন জেলায় কম্বাইন্ড হারভেষ্টর দিয়ে খুবই সময় উপযোগি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এটা কৃষকদের খুব কাজে আসবে। এর পরের কাজ হলো কৃষকরা যাতে উৎপাদিত ধানের দাম পায় তার বন্দোবস্ত করতে হবে। সরকার কৃষকদের কাছে থেকে সরাসরি ধান কেনার কথা বলে , কিন্তু এন্তার অভিযোগ পাওয়া যায় সময়মতো কৃষকদের কাছ থেকে ধান নেওয়া হয়না আবার কারা জানি তালিকা প্রনয়ন করে সে তালিকা প্রনয়ন নিয়ে প্রচুর অভিযোগ উঠে। এসব বিষয় সক্রিয় বিবেচনায় এনে কৃষকদের ধান কেনার সময় আর্দতা ভেদে দাম নির্ধারণ করে সরাসরি ধান কিনে চাতাল মালিকদের নিকট থেকে শুকিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তাতে করে সরকারের গোডাউনে সব রকমের ধান আসবে। আবার মিল মালিকেদেও চাউল সরবরাহের দায়িত্ব দিলে তারা লাভের আশায় কমদামের চাউল সরবরাহ করবে। এতে পুষ্টিমান রক্ষা করা সম্ভব হবে। তবে দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো এই সুযোগে খাদ্য বিভাগের অসৎ কর্মচারীরা বা তালিকা প্রনয়নকারীরা যেন কোনভাবেই নয় ছয় করতে না পারে এর জন্য শক্ত কৌশলী ‘পাহারাদার’ নিয়োগ করতে হবে। সেটাই হবে সময়উপযোগি পদক্ষেপ।