admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২০ ১:১২ অপরাহ্ণ
মুক্ত কলম বক্স অফিস সিঙ্গাপুরঃ সিঙ্গাপুরের আয়তন ৭১৯.৯ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে স্থলভূমির মোট আয়তন ৬৯৯ বর্গকিলোমিটার। দেশটিতে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫৭ লাখ৷ ৪৭ লাখ সিঙ্গাপুরিয়ান, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট ও অন্যান্য পাশ হোল্ডার। ৩২৩০০০ ওয়ার্ক পাশ হোল্ডার যারা ডরমেটরিতে থাকেন এবং ৬ ৬৪০০০ ওয়ার্ক পাশ হোল্ডার যারা ডরমেটরির বাইরে থাকেন৷
সিঙ্গাপুরের জাতিগোষ্ঠীর সিংহভাগ হলেন চীনা ৭৪.৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৩৩.২ শতাংশ বৌদ্ধ, ১৮.৮ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ১৪ শতাংশ মুসলমান ধর্মাবলম্বী বসবাস করে। ২৩ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরে করোনাভাইরাস আক্রান্ত প্রথম রোগী ধরা পড়ে। তারা সবাই চীন থেকে ভ্রমণ করে সিঙ্গাপুরে ফিরছিলেন। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দেশটির সরকার তখন তিনটি রিস্ক লেভেল ঘোষণা করে। প্রতিদিন বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করতে থাকে।

৯ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বলা হয়, সিঙ্গাপুরে তিনজন নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশের এবং অন্য দুজন সিঙ্গাপুরের নাগরিক। ভাইরাসে আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে কেউ কখনোই চীনে ভ্রমণ করেননি।
নিরাপত্তার স্বার্থে সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ওই বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করেনি। তবে এতটুকু জানা যায়, ৩৯ বছর বয়সী ওই বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরে একজন বৈধ পুরুষ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আক্রান্তের পর তাকে ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিস বা এনসিআইসিডিতে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়।
তার শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়৷ দীর্ঘ দুই মাস আইসিইউতে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পর কিছুদিন আগে তাকে জেনারেল ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়৷ বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা ভালো।
হঠাৎ করে করোনাভাইরাস অভিবাসীদের থাকার জায়গা ডরমেটরিগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে৷ বর্তমানে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মাঝে কোনো বিদেশফেরত নেই তবে বেশিরভাগই অভিবাসী কর্মী।
ডরমেটরিতে বসবাসকারী ৩২৩০০০ অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে ১৬৯৯৮ জনই করোনাভাইরাসে পজিটিভ অর্থাৎ শতকরা ৫.৩ ভাগই করোনায় পজিটিভ। ৬৬৪০০০ ওয়ার্ক পাশ হোল্ডার যারা ডরমেটরির বাইরে থাকেন তাদের মধ্যে ৫৭৭ জন করোনাভাইরাসে পজিটিভ অর্থাৎ শতকরা ০.০৯ ভাগ করোনায় পজিটিভ।
বর্তমানে ২৪টি ডরমেটরিকে আইসোলেশন ঘোষণা করা হয়েছে৷ আসুন জেনে নেই সেই ২৪টি ডরমেটরির তালিকা ও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা;
১) S11 Dormitory at Punggol মোট শনাক্ত – ২৫৬২ জন।
২) Sungei Tengah Lodge মোট শনাক্ত – ১৬১৪ জন
৩) Tuas view Dormitory মোট শনাক্ত – ১২৫৭ জন।
৪) Mandai Lodge 1 মোট শনাক্ত – ৪৭২ জন ।
৫) North coast Lodge মোট শনাক্ত – ৪৪৩ জন
৬) Kranji Lodge 1 মোট শনাক্ত – ৪৮৭ জন।
৭) Changi Lodge 2 মোট শনাক্ত – ৪৫৭ জন।
৮) Cochrane Lodge 2 মোট শনাক্ত – ৩৭৯ জন৷
৯) 31 Sungei Kadut Avenue মোট শনাক্ত – ২২৪ জন।
১০) Jurung penjuru Dormitory মোট শনাক্ত – ৭১৫ জন।
১১) Westlight Mandai মোট শনাক্ত – ৪৪১ জন
১২) Cochrane Lodge ২ মোট শনাক্ত- ৪৫৭ জন৷
১৩) PPT Lodge 1 A মোট শনাক্ত – ৩১৮ জন
১৪) Westlight Toh guan dormitory মোট শনাক্ত – ৩৮২ জন।
১৫) 21B Senoko Loop মোট শনাক্ত – ১৭৭ জন।
১৬) Homestay Lodge মোট শনাক্ত – ৩২৯ জন
১৭) Toh guan dormitory মোট শনাক্ত – ১৯৩ জন
১৮) Acacia Lodge মোট শনাক্ত – ১৮১ জন
১৯) Shaw Lodge মোট শনাক্ত – ২৩৪ জন
২০) Tuas south dormitory মোট শনাক্ত – ৩১৬ জন৷
২১) Tampanies Dormitory মোট শনাক্ত – ১৩৮ জন
২২) Avery Lodge dormitory মোট শনাক্ত – ৩৭৬ জন।
২৩) Cassia Penjuru মোট শনাক্ত – ৩১৯ জন।
২৪) CDPL Tuas dormitory মোট শনাক্ত – ৩৫৭ জন।
এটা হলো আইসোলেশনে থাকা ২৪টি ডরমেটরির করোনায় আক্রান্তদের তালিকা৷ এছাড়া অন্যান্য ডরমিটরিগুলোতে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত করা হয়েছে। ডরমেটরিগুলোতে অধিকহারে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি হবার পেছনে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণ দায়ী করেছেন৷ এর মধ্যে অন্যতম হলো অল্প জায়গায় অধিক লোকের বসবাস৷ ডরমেটরিগুলোতে একই রুমে ১৬ থেকে ৩২ জন বাস করে। তাদেরকে সবাইকে কমন টয়লেট, গোসলখানা, ডাইনিং রুম ব্যবহার করতে হয়৷ তাই রুমের একজন করোনায় আক্রান্ত হলে অন্যদের মাঝে খুব দ্রুত ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে।
তাছাড়া বর্তমানে রুমে অবস্থান করতে হলেও অনেকেই সামাজিক দূরত্ব মানছে না। তারা দলবদ্ধভাবে আড্ডা দিচ্ছে, তাস খেলছে যা ইতোমধ্যে আমরা ফেসবুক ভিডিওতে দেখেছি৷ সিঙ্গাপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী বর্তমানে দেশটিতে অবস্থান করছে। যাদের বেশিরভাগই সেখানকার ডরমেটরিগুলোতে বসবাস করেন। ২১ মার্চ শনিবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথমবারের মতো দুই জন রোগী মারা যান। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল দেশটিতে এটিই প্রথম কোনো মৃত্যুর ঘটনা।
সিঙ্গাপুরে ৭৫ বছর বয়সী এক নারী ও ৬৪ বছর বয়সী এক ইন্দোনেশীয় কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওই নারী আগে থেকেই হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে তার শরীরে কোভিড-১৯ ভাইরাসটি শনাক্ত হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। ২৬ দিন আইসিইউতে থাকার পর তার মৃত্যু হয়েছে। আর ওই ইন্দোনেশীয় নাগরিক ১৩ মার্চ থেকে আইসিইউতে ছিলেন। তার আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। সিঙ্গাপুরে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সর্বমোট ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১ লা মে ৪৭ বছর বয়স্ক এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর কনফার্ম হয়েছিল তিনি করোনাভাইরাসে পজিটিভ ছিলেন৷ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার জন্য পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে৷ তাছাড়া ৫ মে ৪৪ বছর বয়স্ক একজন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এই বাংলাদেশি হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসার জন্য ২৯ এপ্রিল Khoo Teck puat হাসপাতালে ভর্তি হন। সেদিনই পরীক্ষায় তার করোনায় পজিটিভ নিশ্চিত হয়।
সিঙ্গাপুরে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি হিসিয়েন লুং ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার সার্কিট ব্রেকারের মেয়াদ আগামী ১ জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী লি বলেন, সরকার ডরমেটরিতে অবস্থানরত অভিবাসীদের সিঙ্গাপুরের স্থানীয় নাগরিকদের মতোই দেখভাল করবে, যা অভিবাসীরা ইতোমধ্যে পেয়ে আসছেন। সিঙ্গাপুরে কোনো অভিবাসী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে সিঙ্গাপুর সরকার তার চিকিৎসা ব্যয়ভার বহন করছে।
প্রধানমন্ত্রী ভাষণের শুরুতে সিঙ্গাপুরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম বাংলাদেশির কথা উল্লেখ করেন। তার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। তার সুস্থ হতে একটু সময় লাগবে। আশা করি তিনি খুব দ্রুত তার সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকে কোলে তুলে নিতে পারবেন। সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সিঙ্গাপুর সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ হাইকমিশনও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে প্রবাসীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।