admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল, ২০২০ ১২:০১ অপরাহ্ণ
সারা বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে । ইউরোপের দেশগুলোতে ভাইরাসের সংক্রমণ স্থিতিশীল বা অনেক ক্ষেত্রে কমে আসলেও আফ্রিকার অনেক দেশে এটি শুরু হচ্ছে মাত্র। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য বলছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো বিশ্বে এখন এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ লাখ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ানোর পর এই তথ্য পাওয়া গেলো। চীনের সরকারি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যু হয়েছিল গত ১১ই জানুয়ারি। এর পর থেকে ২১০টিরও বেশি দেশ ও এলাকা এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫টি দেশে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। যদিও এসব দেশের মধ্যে মৃতের সংখ্যায় বেশ পার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং স্পেনে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে বলে হিসাব করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ শনিবার ঘোষণা করে যে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশটির হাসপাতালগুলোতে এ পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে।
হোম সেক্রেটারি প্রিতি পাটেল এই সংখ্যাকে বিয়োগান্তক এবং ভয়ংকর মাইলস্টোন বলে উল্লেখ করে বলেন পুরো দেশ শোকাহত। যেহেতু যুক্তরাজ্যে প্রতিদিন মৃতের সংখ্যার সাথে বাড়িতে ও নার্সিং হোমে মারা যাওয়াদের সংখ্যা যুক্ত করা হয় না, তাই প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা দেশ ফ্রান্স বলছে, শনিবার তাদের মৃতের সংখ্যা ৩৬৯ জন বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ফ্রান্সে ভাইরাসের কারণে ২২ হাজার ৬১৪ জন মারা গেছে। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন মানুষের সংখ্যা টানা ১৭ দিনের মতো কমেছে।
সর্বশেষ অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে যেসব মানুষ একবার আক্রান্ত হওয়ার পর সেরে উঠেছে তারা আবারো আক্রান্ত হওয়ার ভয় থেকে সুরক্ষিত নয়। নিউ ইয়র্কের রাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো বলেন, কোভিড-১৯ এর পরীক্ষা করানোর জন্য তিনি স্বাধীন ফার্মেসিগুলোকে অনুমোদন দেবেন। তিনি বলেন, চারটি হাসপাতালে তিনি অ্যান্টিবডির স্ক্রিনিং আরো বাড়াবেন। রাজ্যটিতে ১৬ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। বেলারুশের একটি এতিমখানায় ১৩ জন প্রতিবন্ধী শিশু এবং ১০ জন কর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সরকারের সহায়তা চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিছু এলাকায় সংক্রমণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বলেছিল যে আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের প্রবণতা উর্ধ্বমুখী। ডা. টেডরস আধানম ঘেব্রেয়েসুস বলেন, পশ্চিম ইউরোপে যেখানে সংক্রমণ স্থিতিশীল বা কমে আসছে সেখানে অনেক দেশে সংক্রমণ মাত্র শুরু হয়েছে। কিছু দেশে যেখানে সংক্রমণ আগেই দেখা দিয়েছিল সেখানে আবারো সংক্রমণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তিনি বলেন। এরকম একটি দেশ হচ্ছে সিঙ্গাপুর। যেখানে এর আগে ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে পারা জন্য প্রশংসা করা হয়েছিল, সেখানকার শিল্পাঞ্চলের কাজের ক্ষেত্র এবং ঘনবসতিপূর্ণ শ্রমিকদের আবাস্থলে সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছে। এশিয়ার অন্যান্য স্থানের মধ্যে চীন জানিয়েছে যে সেখানে গত টানা ১০ দিন ধরে কেউ মারা যায়নি এবং দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, গত দুই দিনে কোন মৃত্যু ঘটেনি দেশটিতে।
দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করা কঠিন কেন পরিসংখ্যানবিদরা বলছেন যে, নথিবদ্ধ করা মৃতের সংখ্যা সব সময় একটি দেশে মহামারির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে নাও পারে। যুক্তরাষ্ট্রে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা পাওয়া গেছে। কিন্তু সেখানে অনেক দেশের তুলনায় লোকসংখ্যা অনেক বেশি। ৩৩ কোটি মানুষের দেশটিতে পশ্চিম ইউরোপের ৫টি দেশ যথা- যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং স্পেনের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ বাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইউরোপীয় অনেক দেশেই জনসংখ্যার তুলনায় মাথাপিছু মৃত্যুহার বেশি বলে জানা গেছে। আর সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে ইউরোপে। কাকে কাকে গণনার মধ্যে ফেলা হচ্ছে তার উপরও নির্ভর করে যে মৃত্যুর সংখ্যা কত হবে। অনেক দেশ কেয়ার হোমে মৃত্যুর সংখ্যা সংযুক্ত করায় একটি সর্বাত্মক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু অনেক দেশই শুধু হাসপাতালে মারা যাওয়াদের সংখ্যা হিসাব করছে যাদের মধ্যে কোভিড-১৯ এর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এক কোটি ১৪ লাখ মানুষের দেশ বেলজিয়ামে ৬৯১৭ জন মারা গেছে। দেশটিতে মোট মৃতের সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি বয়স্ক মানুষদের কেয়ার হোমে হয়েছে এবং বেশিরভাগই সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যার উপর হিসাব করা হয়েছে। যার কারণে দেশটির সংক্রমণের সংখ্যা আরো বেশি মারাত্মক বলে মনে হচ্ছে।
করোনাভাইরাসের আয়ুঃ এটা এখনও পরিষ্কার নয় যে কোভিড-১৯ এর জীবাণু মানবদেহের বাইরে কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে আরো যেসব করোনাভাইরাস আছে, যেমন সার্স ও মার্স, সেগুলো লোহা, কাঁচ এবং প্লাস্টিকের গায়ে ৯ (নয়) দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ভাইরাস ঠাণ্ডা জায়গায় ২৮ দিনও বেঁচে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথের একজন ভাইরোলজিস্ট নিলৎজে ফান ডোরমালেন তার সহকর্মীদের নিয়ে গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন কোভ-২ বা সার্স ভাইরাস কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে। তাতে দেখা গেছে, কাশি দেওয়ার পর থেকে ড্রপলেটের মধ্যে এই ভাইরাসটি তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। ক্ষুদ্র ড্রপলেটে, যার আকার ১ থেকে ৫ মাইক্রোমিটার (মানুষের চুলের ৩০ গুন চিকন) সার্স ভাইরাস কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে কোভ-২ ভাইরাস কার্ডবোর্ডের মতো শক্ত জিনিসের ওপর ২৪ ঘণ্টা আর প্লাস্টিকের জিনিসের গায়ে দুই থেকে তিন দিনও বেঁচে থাকতে পারে। গবেষণা বলছে, ভাইরাসটি দরজার হাতল, প্লাস্টিক ও লেমিনেটেড ওয়ার্কটপ ও কঠিন বস্তুর ওপর দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। আর কপারের কোন জিনিসে পড়লে এর মৃত্যু হতে চার ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে।
নির্মূলের উপায়ঃ গবেষণায় দেখা গেছে করোনাভাইরাসকে এক মিনিটেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যেতে পারে। ৬২-৭১% এলকোহল মিশ্রিত তরল পদার্থ দিয়ে কোনো জিনিসকে করোনামুক্ত করা যায়। ০.৫ শতাংশ হাইড্রোজেন প্রিঅক্সাইড এবং ০.১% সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট মেশানো ব্লিচ দিয়েও করোনাভাইরাস নির্মূল করা সম্ভব। উচ্চ তাপমাত্রা ও আদ্রতার কারণেও অন্যান্য করোনাভাইরাসের দ্রুত মৃত্যু হতে পারে। দেখা গেছে সার্সের জন্যে দায়ী করোনাভাইরাস ৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে না।
কতোক্ষণ বেঁচে থাকে কোভিড-১৯ এর জীবাণুঃ বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোভিড-১৯ এর জন্যে দায়ী ভাইরাসটি কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে তা নির্ভর করে এটি কোন ধরনের বস্তুর গায়ে পড়েছে তার ওপর। দরজার শক্ত হাতল, লিফটের বাটন এবং কিচেন ওয়ার্কটপের মতো শক্ত জিনিসের গায়ে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা টিকে থাকতে পারে। তবে এর আগের গবেষণায় দেখা গেছে সহায়ক পরিবেশে সব ধরনের করোনাভাইরাস এক সপ্তাহও বেঁচে থাকতে পারে।তবে কাপড়ের মতো নরম জিনিসের গায়ে এটি এতো লম্বা সময় বেঁচে থাকতে পারে না। ফলে আপনি যে কাপড়টি পরেছেন এবং তাতে যদি ওই ভাইরাসটি থাকে, জামাটি একদিন কিম্বা দুদিন না পরলে সেখানে ভাইরাসটি জীবিত থাকার আর সম্ভাবনা নেই। মনে রাখতে হবে, কোভিড-১৯ এর ভাইরাসটি লেগে আছে এরকম জিনিসে শুধু স্পর্শ করলেই আপনি আক্রান্ত হবেন না। শুধু স্পর্শ করার পর আপনি যদি হাত দিয়ে মুখ, নাক অথবা চোখ স্পর্শ করেন তাহলেই এই ভাইরাসটি আপনার শরীরে ঢুকে পড়বে। তাই এই ভাইরাসটি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ একটি করণীয় হচ্ছে হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ না করা।