admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ১:০২ অপরাহ্ণ
তীব্র সমালোচনার পরও বিতর্কিত চীনা কোম্পানিকেই দেওয়া হচ্ছে মধ্যপাড়ার লাভজনক পাথর খনির কাজ। পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও রহস্যজনকভাবে তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ পাথর উত্তোলনের কর্মযজ্ঞ। কোনো ধরনের দরপত্রও আহ্বান না করেই ‘ডাইরেক্ট পারচেজ মেথডে’ (ডিপিএম) বড় পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির চীনা ঠিকাদার এক্স এমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামকে এ কার্যাদেশ দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য তাদের কাজ দেওয়া হলেও পরে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে জানা যায়। এরকম অনভিজ্ঞ কোম্পানির মাধ্যমে পাথর খনির কাজ করানো হলেও শুধু পাথর খনি নয় জনগণ এবং পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে মধ্যপাড়া গ্রানাইড মাইনিং কোম্পানির (এমজিএমসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম কামরুজ্জামান বলেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও আমরা শুনেছি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির চীনা ঠিকাদার এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়াম পাথর খনিতে কাজ করার আবেদন করেছে। যেহেতু সময় নেই তাই ডিপিএম পদ্ধতিতে কোনো কোম্পানিকে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া যায় কি না সে বিষয়ে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে। তাদের মতামতের পরই বিষয়টি এমজিএমসিএলের পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এরপর মন্ত্রণালয়কে জানিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কয়লা ও পাথর উত্তোলনের কাজ এক নয়। দুটি ক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়লা নরম বস্তু যা কেটে কেটে উত্তোলন করতে হয়। অপর দিকে পাথর কঠিন বস্তু হওয়ায় ড্রিলিং কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ব্লাস্টিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলন করতে হয়। এজন্য বিশেষায়িত জ্ঞান ও পাথর খনিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা দরকার হয়। হার্ডরক মাইনিংয়ে অনভিজ্ঞ কোল মাইনিং কোম্পানিকে চলমান খনির কাজ দেওয়া হলে খনিটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। একই সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে খনি এলাকার মানুষ ও পরিবেশ। অভিযোগ রয়েছে এতকিছুর পরও মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) একটি অশুভ সিন্ডিকেট ওই চীনা কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। এর অংশ হিসেবেই মধ্যপাড়া পাথর খনিতে কাজ করা বেলারুশ ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়া কোম্পানি জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) চুক্তি নবায়ন না করার কথা জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে এমজিএমসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি জিটিসির চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত নতুন করে পাথর উত্তোলনের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। এধরনের একটি খনিতে দরপত্রের মাধ্যমে কোম্পানিকে কার্যাদেশ দিতে প্রায় ১ বছর সময় লাগে। সেখানে সময় আছে মাত্র ১ মাস। এই অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রাখার জন্য চীনা কোম্পানিটিকে ডাইরেক্ট পারচেজ মেথডে (ডিপিএম) কাজ দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। এ বিষয়ে মতামত নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা কমিশনের আওতাধীন সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিসিইউ) কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সিপিটিইউ এ নিয়ে কোনো মতামত দেয়নি।
জিটিসি জানায়, ২০১৪ সালে করা চুক্তি অনুযায়ী তাদের ৬ বছর খনিতে কাজ করার কথা। কিন্তু এমজিএমসিএলের নানা প্রতিবন্ধকতা, ড্রয়িংÑ ডিজাইন অনুমোদন না করা এবং মালামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির অনুমতি না দিয়ে ৪৭ মাস কাজ না করিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল তাদের। এমনকি তাদের পাওনা পর্যন্ত আটকে রাখা হয়েছিল ৩ বছর। একারণে তারা নতুনভাবে আরও ৪৭ মাস সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এমজিএমসিএল তাতেও আপত্তি দেয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আরবিট্রেশন আদালতে মামলা দায়ের করেছে জিটিসি। চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে ঢাকায় আরব্রিটেশন আদালতে শুনানির কথা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমজিএমসিএলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বড় পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির চীনা ঠিকাদার এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামকে প্রথম দফায় ৬ বছরের জন্য কয়লা উত্তলনের জন্য কাজ দিলেও পরবর্তীতে দুই দফায় চুক্তির মেয়াদ আরও ৮ বছর বাড়িয়েছে। দ্বিতীয় চুক্তি নিষ্পত্তি না করে তাদের ১৮৬ কোটি টাকার জামানত ফেরত দেওয়া হয়েছে। কোল ইয়ার্ডে মজুদকৃত কয়লার মধ্যে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন চুরির বিষয়টিরও নিষ্পত্তি হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিটি প্রতি টন কয়লার জন্য ৩৮ ডলারে কাজ নিয়ে পরবর্তীতে ৯২ ডলারে উন্নীত করেছে। ফলে বড় পুকুরিয়া থেকে কয়লা কিনে সংশ্লিষ্ট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম ৩ গুণ বাড়াতে হয়েছে সরকারকে। উন্নত বিশে^ কোথাও কয়লা উৎপাদনের জন্য কোনো ঠিকাদার টন প্রতি ৩০ ডলারের বেশি নিচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো সস্তা মজুরির দেশে ২২ ডলারের বেশি হওয়া উচিত না। তারপরও তারা কয়লা উত্তোলন করছে টন প্রতি ৯২ ডলারে। অথচ একই এলাকায় অবস্থিত পাথর মাইনিং কোম্পানি জন্য ভিন্ন আইন। চুক্তি অনুযায়ী জিটিসিকে ৬ বছরের জন্য কাজ দিলেও বাস্তবে তারা কাজ করেছে মাত্র আড়াই বছর। বাকি সাড়ে ৩ বছর তাদের কাজ না করে বসে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। অথচ মাত্র ১২ ডলারে কোম্পানিটি পাথর উত্তোলন কাজ করছে।
জানা যায়, মধ্যপাড়া পাথর খনিতে ৪৭ মাস কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে তদন্ত করার জন্য ২০১৭ সালে পেট্রোবাংলা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পেট্রোবাংলার তৎকালীন পরিচালক আমিনুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে ৮ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তাদের রিপোর্টে জিটিসিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ২ বছর সময় বাড়ানোর সুপারিশ করে। কিন্তু সেই রিপোর্টও আমলে নেয়নি কতৃপক্ষ। রিপোর্টে আরও বলা হয়, শিলা উৎপাদন ও স্টোপ উন্নয়ন কাজে এমজিএমসিএল এর দেওয়া যন্ত্রপাতিই জিটিসি ব্যবহার করত। কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে এসব যন্ত্রপাতির মজুদ পুরোটাই শেষ হয়ে গেলেও এমজিএমসিএল তা জিটিসিকে দেয়নি। যার কারণে ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে খনির কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এনিয়ে বার বার লিখিতভাবে জানালেও কর্ণপাত করেনি এমজিএমসিএল। উল্টো ৬ বছরে ১১ জন এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) বদল করা হয়।