admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১০ জুন, ২০২০ ১২:২৬ অপরাহ্ণ
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন প্রবৃদ্ধি নয় দৃষ্টি থাক জীবন-জীবিকা রক্ষায়। করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে গতানুগতিক না করে বিশেষ বাজেট দেওয়ার প্রস্তাবনা দিয়েছে বিএনপি। তিন বছর মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার আলোকে ২০২০-২১ অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে জোর না দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা ও জীবিকার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ১৩ দফা বাজেট প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। মঙ্গলবার সকালে উত্তরার নিজ বাসা থেকে বাজেট ভাবনা : অর্থবছর ২০২০-২১ শীর্ষক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই প্রস্তাবনা দেন।
বিএনপি উত্থাপিত ১৩ দফা প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে- অগ্রাধিকার হিসেবে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমকল্যাণ, কৃষি, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও পলিস্ন উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, সর্বজনীন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠন, সরকারি বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি ও গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কর্মহীন, কর্মক্ষম, বেকার, দরিদ্র মানুষদের নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান প্রভৃতি। প্রস্তাব উপস্থাপনের শুরুতে গত ৪ এপ্রিল করোনা মহামারি মোকাবিলায় বিএনপির পক্ষ থেকে ৮৭ হাজার কোটি টাকার
আর্থিক সহায়তার যে প্যাকেজ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তাকে বাজেট প্রণয়নের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, করোনা সংকটকালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে জোর না দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা ও জীবিকার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। করোনা সংক্রমণ রোধ করতে না পারলে কোনোভাবেই অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য খাতে এহেন ঝুঁকি থাকলে অর্থনীতির স্বস্তির কোনো অবকাশ নেই। বিএনপি মনে করে, তিন বছর মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার আলোকে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোয় মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ে নতুন ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, অর্থনীতির ক্রমহ্রাসমান সংকোচন রোধে কর্মসংস্থান ধরে রাখতে হবে, আয় সংকোচন রোধ করতে হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে চরম দুরবস্থার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, করোনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সারাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কীভাবে ভেঙে পড়েছে। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে রিস্টোর করতে হবে, পুনর্গঠিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল করতে হবে। এমন টেকসই ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি করোনা মহামারির মতো সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্তসংখ্যক বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয় যারা যুদ্ধকালীন অবস্থার মতো সর্বদা প্রস্তুত থাকবে একটি ইন বিল্ড সিস্টেমের আওতায়।
স্বাস্থ্য খাতে তথা প্রত্যেকের জন্য পারিবারিক ডাক্তার, নার্স ও অবকাঠামোসহ সামগ্রিক ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যভাতার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে বিএনপির বাজেট প্রস্তাবনায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে ‘দিন আনে দিন খায়’ শ্রেণির মানুষদের সর্বজনীন সামাজিক কর্মসূচির আওতায় এনে তাদের নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান, বেকার ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিশু প্রতিপালন ভাতা, পেনশন ভাতা, আবাসন সুবিধা, স্বাস্থ্য ভাতা প্রদানে এই খাতে জিডিপির ৬-৭ শতাংশ বরাদ্দ, আইটি প্রযুক্তি ও গবেষণা খাতে বিশেষ বরাদ্দ, কৃষি ও খাদ্য খাতে জিডিপি ও বাজেটের কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ ও ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ বরাদ্দ, শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা খাতে বরাদ্দ জিডিপির দশমিক ৭৩ শতাংশ ও বাজেটের ২ দশমিক ৮১ শতাংশ বৃদ্ধি, সবুজ শিল্পায়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতি উজ্জীবন, সমন্বিত শিল্পায়ন ও অবহেলা উন্নয়নের ইকু্যইটি ম্যাচিং তহবিল ও কৃষি কমিশন গঠন এবং প্রবাসীদের সহজশর্তে ঋণ প্রদানের সুপারিশও করা হয়েছে বিএনপির এই প্রস্তাবনায়।
পোশাক শিল্প খাতে মালিক সমিতির শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, মহামারি সংকটকালে শ্রমিকরা যাতে কর্মহীন হয়ে না পড়ে সেজন্য ৫ হাজার কোটি টাকা আর্থিক প্রণোদনা নিয়েছে মালিকরা। প্রণোদনাও নেবেন, ছাঁটাইও করবেন- এই দুইটা একসঙ্গে চলতে পারে না। মোদ্দাকথা, এই সংকট চলাকালে শ্রমিক ছাঁটাই হবে অমানবিক ভুল সিদ্ধান্ত।
মহামারি পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, বিদু্যৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ ভর্তুকি বাদ দেওয়া, অতিরিক্ত জনবলের বিষয়ে ব্যবস্থাগ্রহণ, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উৎস থেকে বিদেশি অনুদান বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি কম সুদের ও গ্রেস পিরিয়ড সম্পন্ন বিদেশি ঋণ নেওয়া, অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ না দেওয়া, ট্রেজারি বিল ও সঞ্চয়পত্রের ঋণ পরিশোধ ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার আমদানি তহবিল গঠন, সহজে কর আদায়ের খাতসমূহ এক্সপেস্নার করা, দেশে অবস্থানরত কর্মরত অনিবন্ধিত প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিট ও আয়কর বাবদ প্রায় দেড় মিলিয়ন অর্থ আদায় করা, ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল সক্রিয় করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো থেকে কর বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা অদল-বদল বা কারেন্সি সোয়াপ, বার্টার ব্যবস্থা চালুর পদক্ষেপ গ্রহণ, পুঁজিবাজার বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতি কঠোরভাবে মনিটরিং করার মাধ্যমে বাজেটে অর্থসংকুলানের ব্যবস্থা করার সুপারিশও করা হয়েছে এ প্রস্তাবনায়।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর কমবে। ফলে রাজস্ব আশানুরূপ হবে। বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর জোর দিতে হবে। বাজেট ঘাটতি ও জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত সহনীয় কোঠায় রাখতে হবে। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে তারল্য যোগানের মাধ্যমে এই মহামারির সংকটকাল থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন সক্রিয় রাজস্বনীতির।
ঋণখেলাপি ও সুশাসনের অভাবে অনেকেই ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার, ভর্তুকি ও দুর্নীতি হ্রাসে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনাও করেন মির্জা ফখরুল। এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি সব কিছুর মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। আমূল পরিবর্তন না করলে অর্থনীতি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থবির হয়ে যাবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের আঘাত আসবে। এই পরিবর্তন কীভাবে ঘটবে তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ওপর। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের কাছে সরকার কতটুকু জবাবদিহি করে তার ওপর।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নেই। কারণ তারা জনগণের ভোটের তোয়াক্কা করে না। একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে সরকারের কোনো বৈধ্যতা নেই। তারপরও এই মহাসংকটের সময়ে বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপি দলমতনির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় প্রয়াসের আহ্বান জানাচ্ছে। করোনা সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিণতির দায় বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।