হোম
নাগরিক ভাবনা

নাগরিক ভাবনা: রাষ্ট্রের মালিক কে – জনগণ, না কি আমলাতন্ত্র? বিমানবন্দর থেকেই শুরু হোক জবাবদিহিতার সংস্কার।

অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬ ৬:৫২ অপরাহ্ণ

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের সংবিধান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে -প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পর্যন্ত, জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মচারী। তাদের সাংবিধানিক পরিচয় – প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ অর্থাৎ জনগণের ভৃত্য, তারা জনগণের ওপর কর্তৃত্বকারী কোনো প্রভু নন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বহু ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। অনেক সরকারি দপ্তরে গেলে সাধারণ মানুষ নিজেকেই যেন অপরাধী বা অধস্তন মনে করেন। নাগরিককে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে অনেক কর্মকর্তা এমন আচরণ করেন যেন রাষ্ট্রের মালিক তারাই, আর জনগণ তাদের অনুগ্রহপ্রার্থী।
এই মানসিকতার শিকড় ইতিহাসে প্রোথিত। প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এমন একটি আমলাতন্ত্র গড়ে তুলেছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়; জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা, কর আদায় করা এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করা।

এরপর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৪ বছরে পূর্ব পাকিস্তান একই ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর শিকার হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের অনুগত আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করেছে।

১৯৭১ সালে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও প্রশাসনিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কার আর করা হয়নি। শাসকের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেনি। পরবর্তী সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আমলাতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে আজও অনেক ক্ষেত্রে জনগণ রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে অসহায় আবেদনকারীতে পরিণত হয়েছেন।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যায় দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে। বিমানবন্দর ব্যবহার করেন সাধারণ নাগরিক, প্রবাসী শ্রমিক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসার জন্য বিদেশগামী রোগী এবং বিদেশফেরত বাংলাদেশিরা। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অথচ এই মানুষগুলোকেই বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারি, অপ্রয়োজনীয় হয়রানি, তথ্যের অভাব, সমন্বয়হীনতা, ধীরগতি এবং কখনো কখনো অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়।

অন্যদিকে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, তাদের পরিবারের সদস্যসহ তাদের নিকটতম আত্মীয়স্বজনদের জন্য রয়েছে পৃথক ভিআইপি টার্মিনাল ও বিশেষ সুবিধা। ফলে সাধারণ যাত্রীরা কী দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাওয়া-আসা করেন, তা তাঁদের চোখেই পড়ে না। যে নীতিনির্ধারক কখনো সাধারণ সারিতে দাঁড়াননি, তিনি সেই সারির কষ্টও অনুভব করবেন কীভাবে?

জবাবদিহির সর্বোত্তম ভিত্তি হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। নীতিনির্ধারকেরা যখন নিজেরাই সাধারণ নাগরিকের মতো রাষ্ট্রের সেবা গ্রহণ করেন, তখন সমস্যাগুলো আর পরিসংখ্যান বা অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো বাস্তব উপলব্ধিতে রূপ নেয়।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান ছাড়া অধিকাংশ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাধারণ যাত্রীদের মতোই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। এতে একদিকে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমে, অন্যদিকে তারা নিজেরাই সেবার মান যাচাই করার সুযোগ পান। যখন একজন নীতিনির্ধারক একই লাইনে দাঁড়ান, একই নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে যান এবং একই ব্যাগেজ বেল্টের পাশে অপেক্ষা করেন, তখন ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো তার কাছে কাগজের রিপোর্ট নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে খুবই সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু ভিআইপি সংস্কৃতির লাগামহীন বিস্তার গণতন্ত্রের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি আমলাদেরকে সাধারণ টার্মিনাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। তারা যখন নিজেরাই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াবেন, ধীরগতির ইমিগ্রেশন পার হবেন কিংবা ব্যাগেজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করবেন, তখন সমস্যার সমাধানও দ্রুত খুঁজবেন।
বিমানবন্দর কেবল যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়; এটি একটি দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, নাগরিক মর্যাদা এবং সেবার মানের আয়না। একজন বিদেশি বা প্রবাসী বাংলাদেশি যখন বিমানবন্দরে প্রথম পা রাখেন, তখন সেখানকার অভিজ্ঞতাই তাঁর কাছে রাষ্ট্রের প্রথম পরিচয় হয়ে ওঠে।
যে রাষ্ট্রে নাগরিককে সম্মান করা হয়, সেখানে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। আর যে রাষ্ট্রে নাগরিককে হয়রানি করা হয়, সেখানে সংবিধানের সুন্দর ভাষাগুলো ধীরে ধীরে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি আলাদা করিডরে নয়; জনগণের সঙ্গে একই সারিতে দাঁড়ানোর মানসিকতায়। রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ – এই সাংবিধানিক সত্যকে কেবল সংবিধানের পাতায় নয়, প্রশাসনের প্রতিটি আচরণে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।জবাবদিহিতার সেই যাত্রা শুরু হোক বিমানবন্দর থেকেই। কারণ রাষ্ট্র যদি প্রবেশদ্বারেই নাগরিককে সম্মান করতে শেখে, তবে একদিন সেই সম্মান ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রতিটি সরকারি দপ্তরে, প্রতিটি সেবাকেন্দ্রে এবং সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থায়।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।

বি:দ্র: এই লেখাটি সম্পুর্ন লেখকের একান্ত মতামত।

ফেসবুক মন্তব্য

মতামত জানান :

Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

সর্বশেষ খবর

ছাত্রীকে কুরুচিপূর্ণ বার্তা পাঠানোর অভিযোগে শিক্ষককে গণধোলাই!
অপরাধ 5 hours আগে

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদে উন্মুক্ত বাজেট ঘোষনা।
অর্থনীতি 6 hours আগে

পঞ্চগড়ে ইউএনওর বিরূদ্ধে চাকুরি দেওয়ার নামে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ।
আইন-বিচার 8 hours আগে

নাগরিক ভাবনা: রাষ্ট্রের মালিক কে – জনগণ, না কি আমলাতন্ত্র?
নাগরিক ভাবনা 9 hours আগে

ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদন্ড ও অর্থ জরিমানা।
আইন-বিচার 10 hours আগে

পঞ্চগড়ে নাশকতা মামলায় সাবেক এমপির স্ত্রীসহ ২ জন কারাগারে।
রংপুর 1 day আগে

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উদযাপিত।
জাতীয় 1 day আগে

 বিধবা নারীকে কুপিয়ে হত্যা মামলা তুলে নিতে বাদী ও স্বাক্ষীদের
অপরাধ 1 day আগে

বিশ্ব শিশু শ্রম দিবসে র‍্যালি,আলোচনা সভা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান।
রংপুর 2 days আগে

নাগরিক ভাবনা: যে দেশের শাসকেরাই দেশের চিকিৎসায় ভরসা পান না!
নাগরিক ভাবনা 2 days আগে

পাঠকপ্রিয়

শিরোনাম :

কুড়িগ্রামে ঐতিহাসিক আসনে কঠিন চ্যালেঞ্জে জাপা,মাঠ গরম এনসিপি-বিএনপির। হাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় দিনাজপুর সীমান্ত ৪২ বিজিবির রেড অ্যালার্ট জারি। রোহিঙ্গা মেয়েরা পাচার ছাড়াও বিদেশীদের দ্বারা যৌন কাজে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ে নানা কর্মসূচিতে হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপিত। ঠাকুরগাঁও জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪র্থ জেলা রোভার মুট-২০২৫। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহের প্রদর্শনী ও সমাপনী অনুষ্ঠিত। পার্বতীপুরে জাতীয় প্রাণি সম্পদ ও ডেইরি প্রকল্পের উদ্বোধন। রাণীশংকৈলে জাতীয় প্রাণীসম্পদ সপ্তাহ ও প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত পলাতক শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের লকার ভেঙে ৮৩২ ভরি স্বর্ণ জব্দ রাজশাহীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০ জন ৩ ডিসেম্বর রংপুরে বিভাগীয় মহাসমাবেশ সফল করতে দিনাজপুরে ৮ ইসলামী দলের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব বাহিনী প্রস্তুত: সিইসি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ হাজার কৃষক পাচ্ছে বিনামূল্যে গম বীজ ও সার। মাত্র চার মাসের শিশু সুমাইয়া বাঁচতে চায়! পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি গঠন। ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাজধানীতে  আজ থেকে ঘরে বসেই মেট্রোরেলের কার্ড রিচার্জ করবেন? নীলফামারীতে পাটবীজ উৎপাদনকারী চাষীদের প্রশিক্ষণ। আর কোনো পরিস্থিতি নেই যে নির্বাচন ব্যাহত হবে-ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল  ৫-বছরেও শেষ হয়নি ওয়াশব্লকের নির্মাণ কাজ-জনস্বাস্থ্য অফিস বলছেন বাদ দেন চা খাওয়ার জন্য কিছু নেন। পার্বতীপুরে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের দাবীতে কর্মী সভা। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নদী বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক সমাবেশ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ইউএনও এক গৃহহীন ভারসাম্যহীন নারীর পাশে দাঁড়ালো। ৮ দফা দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর নার্সিং এসোসিয়েশন দিনাজপুর জেলা শাখার স্মারকলিপি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ইউনিয়ন সিএসওর লাইভস্টক সংলাপ সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় প্রেম করে বিয়ে অতপর ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে হত্যা করল স্বামী। দিনাজপুরে ৩ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা মেলা ও পিঠা উৎসবের সমাপনী। দিনাজপুরের বিরলে শতাধিক নেতা-কর্মীর মামলা থেকে বাঁচতে ফ্যাসিস্ট আ,লীগ থেকে পদত্যাগ! অভিযোগ দিয়ে ও কাজ বন্ধ হচ্ছে না আদমদিঘীতে সরকারি জায়গা দখল করে করা হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ! বগুড়ার কইপাড়ায় নববধূ শম্পা হত্যার অভিযোগ, যৌতুক দাবির জেরে স্বামী আটক