অ্যাড: এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬ ৩:২২ অপরাহ্ণ
অনেক জল্পনা-কল্পনা ও জনমত সংগ্রহের পর পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮৭ সালের ১২ নভেম্বর পাক-পাহাড়পুর ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আমার সঞ্চালনায় এবং আমার বাবা কবি মো. নূরুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সভায় ১৪ সদস্যবিশিষ্ট পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রথম কার্যকরী পরিষদ গঠন করা হয়। সভাপতি নির্বাচিত হন আমার বাবা কবি মো. নূরুল আমিন, সহ-সভাপতি মো. মুজিবুল হক খান ও গিয়াসউদ্দিন আহমদ, সম্পাদক মো. নকিবুল হক খান, যুগ্ম সম্পাদক মো. আব্দুল মজিদ, কোষাধ্যক্ষ মো. আব্দুল জব্বার। নির্বাহী সদস্য ছিলেন – মো. ইউনুস ফারুক খান, মো. কাজী বোরহান, মো. সিদ্দিক গজনবী, জাহাঙ্গীর আহমেদ, শাহ্ মাহাতাব উদ্দিন আহমদ, জমির উদ্দিন আহমেদ এবং মো. মোফাজ্জল হোসেন।
১৯৯০ সালের ২৮ ডিসেম্বর, দিনাজপুরের সর্বস্তরের মুসলমানদের উপস্থিতিতে জুমার নামাজের মাধ্যমে এবং আড়ম্বরপূর্ণভাবে পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তীকালে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হলেও কখনো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। কোনো পদ শূন্য হলে মুসল্লিদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনীত করে সেই শুন্যপদ পূরণ করা হতো।
২০১৬ সালের শেষদিকে নতুন কমিটি গঠিত হলে আমি পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদের সম্পাদক হিসেবে ১ জানুয়ারি ২০১৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করি। দায়িত্ব নেওয়ার সপ্তাহখানেক পর এক রিকশাচালককে বললাম, “পাক-পাহাড়পুর জামে মসজিদে চলুন।” তিনি মসজিদটি চিনতে না পেরে জানতে চাইলেন, “রেডক্রিসেন্টের কাছে ঘাঘরা মসজিদে যাবেন?” তখন উপলব্ধি করলাম, মসজিদটির কোনো সাইনবোর্ড নেই বলেই মানুষ এটিকে নিজস্বভাবে “ঘাঘরা মসজিদ” নামে চেনে। বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। পরে আমি নিজ উদ্যোগেই মসজিদের সাইনবোর্ড তৈরি করে সেটি ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে মসজিদে টাঙিয়ে দেই।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আমি সভাপতি হিসেবে আমার পূর্ণ প্যানেল নির্বাচিত হই। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখতে পেলাম, আগের সাইনবোর্ডটি আর নেই। মসজিদে রং করার সময় সাইনবোর্ডটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সেটি আর পুনঃস্থাপন করা হয়নি। ২০২৪ সালের ১লা জানুয়ারি আমি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর চার দিনের মাথায় আমি নিজ উদ্যোগে নতুন একটি সাইনবোর্ড তৈরি করে স্থাপনের উদ্যোগ নিলাম। সাইনবোর্ড টাঙনোর কাজ শেষ হওয়ার পর একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা আমার হৃদয়কে নাড়া দিল।
সাইনবোর্ডটি আগের চেয়ে কিছুটা চওড়া বেশি হওয়ায় মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালের নিচে থাকা কয়েকটি ছিদ্র ঢেকে যায়। মিস্ত্রিকে মজুরি দেওয়ার আগে কাজ পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ দেখি, একটি কবুতর বারবার সাইনবোর্ডের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তার ডানার অস্থির ঝাপটানি আর ব্যাকুল ডাক যেন বুকের ভেতর কাঁপন তুলছিল। মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম, ওর বাসার প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। হয়তো ভেতরে আছে তার ছানা, ডিম কিংবা জীবনসঙ্গী রয়েছে।
আমার পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন বললেন, দুই-একদিনের মধ্যে ছানাগুলো মারা যাবে, তারপর কবুতরগুলো অন্য কোথাও বাসা বানাবে। কিন্তু কথাগুলো আমার হৃদয় মানতে পারল না। আমি কল্পনা করতে লাগলাম – দেয়ালের অন্ধকার খোপে হয়তো ক্ষুধার্ত ছানাগুলো মায়ের অপেক্ষায় মুখ তুলে আছে। হয়তো কোনো ডিম উষ্ণতার অভাবে প্রাণ পাওয়ার আগেই নিভে যাবে। আর বাইরে থাকা মা-বাবা কবুতরগুলো অসহায় হয়ে তাদের সন্তানদের কাছে ফিরতে না পেরে কষ্টে ছটফট করবে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে মিস্ত্রিকে বললাম, যেখানে যেখানে ছিদ্র ছিল, সেখানে সেখানে সাইনবোর্ড কেটে পথ খুলে দিন।
মিস্ত্রি কাজ শেষ করতেই এক বিস্ময়কর দৃশ্যের অবতারণা হলো। মুহূর্তের মধ্যে ফুরুৎ ফুরুৎ করে কয়েকটি কবুতর দেয়ালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। আর বাইরে অপেক্ষমাণ কয়েকটি মা-কবুতর যেন আর এক মুহূর্তও দেরি করতে রাজি নয় – নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভুলে তারা দ্রুত সেই ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ল, যেন তাদের বুকভরা মমতা নিয়ে ছানাদের কাছে ফিরে যাচ্ছে।
সেই দৃশ্য দেখে আমার চোখ ভিজে উঠল। অশ্রু আর ধরে রাখতে পারিনি। মনে হলো, আল্লাহ তাআলা আমাকে অজান্তেই কয়েকটি নিরীহ প্রাণের জীবন বাঁচানোর সুযোগ দিয়েছেন। আমি পরম কৃতজ্ঞতায় মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম।
আজও ভাবলে শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে – যদি সেদিন ওই ছিদ্রগুলো খুলে না দেওয়া হতো, তবে কতগুলো কবুতর, কতগুলো ছানা আর কতগুলো সম্ভাব্য প্রাণ নীরবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেত! একটি সাইনবোর্ডের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ক্ষুদ্র প্রাণগুলোর আর্তনাদ হয়তো কেউ শুনতে পেত না।কিন্তু সেদিন তাদের ফিরে পাওয়ার আনন্দ আর মুক্তির উচ্ছ্বাস আমার জীবনের অন্যতম গভীর মানবিক স্মৃতি হয়ে রয়েছে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।