অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ, ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬ ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
মানুষের জীবনে কিছু সিদ্ধান্ত নিজের ইচ্ছায় নেওয়া হয়, আর কিছু সিদ্ধান্ত যেন অদৃশ্য এক মহাশক্তি আমাদের জন্য পূর্বেই নির্ধারণ করে রাখেন। আমার বিবাহের ঘটনাটিও ছিল ঠিক তেমনই – যেখানে আমার নিজের ইচ্ছার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল একজন পিতার অভিমান, তাঁর দূরদৃষ্টি এবং তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
ছোটবেলা থেকেই আমি অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ ছিলাম। মানুষের দুঃখ-কষ্ট আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। কোনো অসহায় বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্তা, দুঃখিনী কিংবা অন্ধ নারীর অসহায়ত্ব দেখলে আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। মনে হতো, মানুষের জীবন কি এতটাই নিষ্ঠুর হতে পারে? কতবার যে মনে হয়েছে – যদি তাদের জীবনের কিছুটা দুঃখ আমি নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারতাম! এমনকি প্রয়োজনে তাদের জীবনে একটু সুখ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বিবাহ করতেও আমি দ্বিধা করব না – বলে আমার পরিবারের সকলেই, বিশেষ করে আমার বড় বোন রাবেয়া আপা মনে করতেন। এই কারণেই আমার বড় বোন আমার জন্য খুবই চিন্তিত ছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল – আমি হয়তো কোনো একদিন মানবিক আবেগে হঠাৎ করেই কোনো অসহায় নারীকে বিবাহ করে বসব। তাই তিনি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমার জন্য একে একে কয়েক ডজন মেয়ে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই আমি কোনো না কোনো যুক্তি দেখিয়ে বলেছি, না, আমার পছন্দ হয়নি।
অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন, আমি খুব খুঁতখুঁতে। কিন্তু সত্যি বলতে, বিষয়টি মোটেও তা ছিল না। বিবাহ সম্পর্কে আমার আপত্তির মূল কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি তখন বিশ্বাস করতাম, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপদগ্রস্তের হাত ধরা, আর্তপীড়িতের চোখের জল মুছে দেওয়া – এগুলোই আমার জীবনের প্রকৃত আনন্দ। আমি অনুভব করতাম, বিবাহের পর একজন মানুষের জীবনে দায়িত্বের পরিধি বহুগুণ বেড়ে যায়। শুধু স্ত্রী নন, সংসার, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, সামাজিক দায়িত্ব – সব মিলিয়ে মানুষের অধিকাংশ সময়ই সংসারের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
আমি ভয় পেতাম, যদি সংসারের ব্যস্ততায় মানুষের সেবা করার সময়ই না পাই! এই বিশ্বাস থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম – আমি সারা জীবন অবিবাহিত থাকব। এমনকি হাস্যরসের ছলেই একটি কল্পিত সংগঠনের কথা প্রকাশ্যেই সকলকে বলে বেড়াতাম, “লাইফ লং ব্যাচেলার (এল.এল.বি) অ্যাসোসিয়েশন” গঠন করে সেই সংগঠনের আজীবন সভাপতির দায়িত্ব আমি নিজেই পালন করব।
কিন্তু মহান আল্লাহ মানুষের জন্য যে পরিকল্পনা করে রাখেন, তা মানুষের কল্পনারও অনেক ঊর্ধ্বে। আমার বাবা আলহাজ্ব কবি মো. নূরুল আমিন ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল মানুষ। তিনি ভালো মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। আমি যখনই ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরতাম, সে সময়ের নামকরা মিষ্টির দোকান থেকে তাঁর জন্য মিষ্টি কিনতে ভুল করতাম না। বাবা সেগুলো অত্যন্ত আনন্দ ও তৃপ্তির সঙ্গে খেতেন। বাবার সেই হাসিমুখ দেখাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ। ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসের একটি বিশেষ দিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি ঢাকা থেকে মিষ্টি কিনে নিয়ে এলাম। জিনাত ভাবি বাবার ঘরে মিষ্টি রেখে এলেন। কিন্তু অবাক হয়ে ভাবি দেখলেন, বাবা মিষ্টি স্পর্শও করলেন না। সকাল গেল, দুপুর গেল, রাত পেরিয়ে পরদিন সকালও হয়ে গেল – মিষ্টিগুলো ঠিক যেমন রাখা হয়েছিল, তেমনই পড়ে রইল। জিনাত ভাবি শেষ পর্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, আপনি মিষ্টি খাচ্ছেন না কেন?
বাবা শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিয়ে বলেছিলেন,আব্দুল মজিদ সবার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, মানুষের উপকার করছে, অসহায়দের সাহায্য করছে, আর্তপীড়িতদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। আমি তাকে বহুবার বলেছি, বিয়ে করতে। সে আমার কথা শোনেনি। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি – আব্দুল মজিদ যতদিন বিয়ে না করবে, ততদিন তার উপার্জনের টাকায় কেনা কোনো কিছুই আমি খাব না। এমনকি তার সঙ্গে কথাও বলব না। জিনাত ভাবির মুখে বাবার এই কথাগুলো শুনে আমার সমস্ত দৃঢ়তা মুহূর্তের মধ্যেই গলে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, যাঁর সন্তুষ্টির জন্য পৃথিবীর সবকিছু ত্যাগ করা যায়, তাঁর মনেই আমি অজান্তে কষ্টের পাহাড় গড়ে তুলেছি।
সেদিনই আমি আমার সেই কল্পিত “লাইফ লং ব্যাচেলার (LLB) অ্যাসোসিয়েশন”-এর স্বপ্ন চিরদিনের জন্য বিসর্জন দিলাম। ভাবিকে বললাম, “আজকের মধ্যেই তোমরা আমার জন্য মেয়ে পছন্দ করো। আমি আজই বিয়ে করব। তবে একটি শর্ত আছে – আমার অপছন্দের সাতটি বৈশিষ্ট্যের একটি যেন তার মধ্যে না থাকে।
জিনাত ভাবি এবং বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা আমার মেজবোন সুফিয়া আপা সেদিন সারাদিন ঘুরে আমার জন্য পাঁচজন উপযুক্ত মেয়েকে নির্বাচন করেছিলেন। পরে তাঁদের সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত জানানো হলো। পাঁচজনের মধ্যে কামরুন নাহার জেসমিনের পরিচয় প্রথমে আমাকে দেওয়া হয়েছিল, তাকেই আমি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করি। সেদিন হয়তো আমি শুধু একটি বিয়ে করিনি; অজান্তেই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদকে বরণ করে নিয়েছিলাম।
আজ সেই বিবাহিত জীবনের বয়স একচল্লিশ বছর চলছে। এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা পেয়েছি একমাত্র পুত্র আব্দুল কাদের সাগরকে। আজ সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল সরকারের অধীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা গবেষণাগার “ন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব হেলথ (এন.আই.এইচ)” এর প্রথিতযশা বিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সুপরিচিত। আমাদের পুত্রবধূ নাফিসাহ্ ইসলামও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে কর্মরত। তাঁদের সংসার আলোকিত করেছে এক নাতনি ও এক নাতি।
পুত্র ও পুত্রবধূ প্রায় প্রতি বছরই আমাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। তাদের স্নেহে ও ভালোবাসায় আমরা আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ভ্রমণ করি। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে সন্তানের সাফল্য দেখে মনে হয় – আল্লাহর অশেষ রহমত ছাড়া এসব কিছুই সম্ভব হতো না।
তবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার সন্তানের সাফল্য নয়। আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার জীবনসঙ্গিনী।
বিবাহের আগে আমি ভেবেছিলাম, সংসার আমাকে মানুষের সেবা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। অথচ বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। আমার সহধর্মিণী নিজের অনেক ইচ্ছা, আনন্দ ও প্রাপ্য বিসর্জন দিয়েও কখনো আমার মানবতার সেবা ও কল্যাণের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াননি। অসংখ্য দিন আমি অসহায় মানুষের পাশে ছুটে গেছি, রাতবিরাতে কারও বিপদের সংবাদে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি, সামাজিক ও মানবিক কাজে সময় দিয়েছি – কিন্তু সে কখনো বিরক্ত হয়নি, কখনো অশান্তি সৃষ্টি করেনি। বরং নীরবে সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে আমাকে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করার শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে।
আজ আমি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি – একজন আদর্শ জীবনসঙ্গিনী মানুষের স্বপ্নকে ছোট করেন না; বরং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নীরব শক্তিতে পরিণত হন।
আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, যদি সেদিন বাবা মিষ্টির থালায় হাত না সরিয়ে রাখতেন, যদি তিনি সেই কঠিন অভিমান না করতেন, তাহলে হয়তো আমি জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ – একজন আদর্শ সহধর্মিণী, একটি সুন্দর পরিবার, স্নেহময় সন্তান, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি, সাফল্যমণ্ডিত উত্তরসূরি এবং পূর্ণাঙ্গ সংসার – কোনোটিই পেতাম না।
একদিন আমি ভেবেছিলাম, বিবাহ করলে মানুষের সেবা করা যায় না। কিন্তু আজ জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে – মানুষের সেবার জন্য শুধু একটি বড় হৃদয়ই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি মহান হৃদয়ের জীবনসঙ্গীও।
আর আমার জীবনের সেই মহান প্রাপ্তির পেছনে যাঁর নীরব অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি আমার প্রয়াত বাবা। তাঁর সেই একটিমাত্র অভিমানই আমার জীবনকে অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার পথে নিয়ে এসেছিল।
আজও তাই গভীর কৃতজ্ঞতায় বাবার কথা স্মরণ করি এবং মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি – আল্লাহ যেন আমার বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন এবং আমার জীবনসঙ্গিনীসহ পরিবারের সকলকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও উত্তম প্রতিদান দান করেন, আমীন!
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।