অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ,ঢাকা || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২৬ ৩:৫৫ অপরাহ্ণ
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো কোনো ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে না কিন্তু হৃদয়ের গভীরতম স্থানে আজীবন অম্লান হয়ে থাকে। ২০২১ সালের ৯ অক্টোবরের রাতটি আমার জীবনে তেমনই একটি রাত – যে রাতে আমি আমার ছেলেকে নতুন করে চিনেছিলাম; শুধু ছেলে হিসেবে নয়, একজন মহৎ মানুষ হিসেবে, একজন আদর্শ সন্তান হিসেবে, এমনকি একজন পিতার রূপেও।
সেদিন আমি একাই কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি’র উদ্দেশে যাত্রা করেছিলাম। বহুদিন পর ছেলে সাগর, পুত্রবধূ নাফিসাহ্ এবং মাত্র পাঁচ মাস বয়সী আদরের নাতনি আনিরার সঙ্গে দেখা হবে – এই আনন্দে মন ভরে ছিল।
কাতার এয়ারওয়েজের সেবার মান সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। বিমানের স্টুয়ার্ড ও এয়ার হোস্টেসদের আন্তরিকতা, হাসিমুখে সেবা, রুচিসম্মত খাবার, ফলমূল, গরম-ঠান্ডা পানীয় – সবকিছুই ছিল অনবদ্য। কিছুক্ষণ পরপরই ট্রলি নিয়ে তারা হাজির হতেন। এছাড়াও যাত্রীরা যখন যা চাইতেন, তখনই সেটি এনে দিতেন।
কিন্তু আমার শরীর তখন খুব একটা ভালো ছিল না। পেটের সমস্যা ছিল বলে অনেক কিছু খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নিজেকে সংযত রেখেছিলাম। তবু আমেরিকায় পৌঁছানোর প্রায় তিন ঘণ্টা আগে একটি চকলেট জাতীয় কেক খাওয়ার পরই হঠাৎ পেটের ভেতর অদ্ভুত শব্দ শুরু হলো। আমি বুঝলাম, বড় ধরনের বিপদ সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর শুরু হলো এক অসহায় লড়াই। পরবর্তী তিন ঘণ্টায় অন্তত বারো থেকে তেরোবার বিমানের টয়লেটে ছুটতে হয়েছে। শরীর থেকে শুধু পানির মতো তরল পদার্থ বের হচ্ছিল। নিজের শরীরের ওপর নিজেরই কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। বিমান অবতরণের সময় ঘনিয়ে এলো। সঙ্গে কোনো ডায়াপার ছিল না। শেষ পর্যন্ত পরনের স্যান্ডো গেঞ্জিটিই খুলে ডায়াপারের মতো ব্যবহার করতে হলো। জীবনের সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করেছিলাম – মানুষ যত বড়ই হোক, অসুস্থতা তাকে এক মুহূর্তেই অসহায় শিশুর মতো করে দিতে পারে।
সন্ধ্যা আটটার দিকে ওয়াশিংটন ডিসি বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। বাইরে সাগর আব্বু আমার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সে তার নিজ গাঠিতে নিজেই চালিয়ে আমাকে বাসায় নিয়ে আসে। পুত্রবধূ সুন্দর করে সেজে আছে। পাঁচ মাসের ছোট্ট আনিরাকেও সাজিয়ে রাখা হয়েছে দাদুকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। ঘরে ঢুকতেই পুত্রবধূ হাসিমুখে আমাকে সালাম ও কদমবুসি করল এবং আদরের আনিরাকে আমার কোলে তুলে দিল।
কিন্তু সেদিন আমার সমস্ত ভালোবাসা, আনন্দ আর আবেগকে হার মানিয়ে দিয়েছিল অসুস্থ শরীরের নির্মম তাগিদ। আমি আনিরাকে বৌমার কোলে ফিরিয়ে দিয়ে শুধু বললাম, “ওয়াশরুমটা কোথায়?” সাগর আমাকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে চাইছিল। কিন্তু তখন আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করার অবকাশ ছিল না। তাকে দ্রুত বাইরে যেতে বলতেই হলো।
তারপর যা ঘটল, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বিব্রতকর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। গেঞ্জি দিয়ে বানানো অস্থায়ী ডায়াপার সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছিল। প্যান্টও নোংরা হয়ে গিয়েছিল। নিজের কাছেই নিজেকে অসহ্য লাগছিল। মনে হচ্ছিল, যেন আমি নিজের কাছেই ছোট হয়ে গেছি। গোসলের সময় গায়ে মাখা সাবান পেলাম না। শ্যাম্পু এবং লিকুইড সাবান ব্যবহার করে, কাপড় বদলে, নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে আবার তাদের কাছে ফিরে এলাম।
পাঁচ মসের নাতনি আনিরাকে একটু আদর করতেই আমার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিল। তাকে আমি কোলে নিতেই সে তার শিশুসুলভ ভাষায় কত গল্প যে করল যার ইয়ত্তা নেই! সেই নিষ্পাপ মুখের হাসি আর হাত-পা ছুড়াছুড়ি আমার সমস্ত কষ্ট কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দিল। রাত গভীর হলো। গল্প-আড্ডা, হালকা নাস্তা, তারপর রাতের খাবার শেষে আলাদা ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু রাত দেড়টার দিকে ঘুম ভেঙে গেল।
পিছনে হাত দিতেই বুঝলাম, আবারও দুর্ঘটনা ঘটে গেছে।
লাইট জ্বালিয়ে দেখি – শরীরের কম্বল, বিছানার চাদর, তোষক, খাটের জাজিম – সব ভিজে নোংরা হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে লজ্জায়, অপমানে, অসহায়ত্বে আমার মাথা যেন নত হয়ে গেল, মনে হচ্ছিল মরে যাওয়াটাই উত্তম।
আবার গোসল করলাম। বের হয়ে দেখি, পাশের ঘরে সাগর তার গবেষণার কাজে ব্যস্ত। খুব সংকোচ তার কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বললাম। এরপর আমি এমন একটি দৃশ্য দেখলাম, যা আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলতে পারব না।
সাগর আব্বু একবারের জন্যও বিরক্ত হয়নি। একবারের জন্যও তার ভ্রু, নাক, মুখ, চোখ, কপাল কুঁচকায়নি বা ঘৃনায় হাত জড়সড় হলো না । একবারের জন্যও মুখে ঘৃণার কোনো ছাপ ফুটে ওঠেনি। সে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে চরম মমতার সাথে আমার নোংরা কাপড়-চোপড়, কম্বল, বিছানার চাদর, তোষক সব নিজ হাতে সংগ্রহ করে ওয়াশিং মেশিনে নিয়ে ধুয়ে ফেলল। যতটা সম্ভব জাজিমটা পরিষ্কার ও ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে পরিস্কার করে ইলেক্ট্রিক ইস্ত্রি দিয়ে শুকিয়ে নিল। তারপর জীবাণুনাশক ও সুগন্ধি স্প্রে করে দিল। আমি তখন নিজের দিকে তাকাতেই পারছিলাম না।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময় তখনও বাকি ছিল। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো সে আমাকে হালকাভাবে হলেও দুই-একটা কথা শোনাবে, অথবা পরোক্ষভাবে হলেও কিছু বলবে।
কিন্তু আমার কল্পনা ও ধারনার কোনো কথাই সে বলল না। সে নিজেই বারবার আমার কাছে ক্ষমা চাইতে লাগল। সে বললো, “আব্বু, আমাকে মাফ করে দিও।
আমি তোমার শরীরের অবস্থা বুঝতে পারিনি। আমি যদি আগে বুঝতাম, তাহলে তোমার জন্য ডায়াপারসহ আরো অনেক কিছুরই ব্যবস্থা আমার করা উচিৎ ছিল। আমি তোমার কষ্টটা বুঝতে পারিনি। আমারই ভুল হয়েছে। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও, আব্বু।” সাগর আব্বু আরো অনেক কথা সে বলল।
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো অভিনয় ছিল না। ছিল না কোনো কোনো দায়সারা দায়িত্ববোধ। ছিল শুধুই এক সন্তানের নিখাদ ভালোবাসা, ভক্তি ও শ্রদ্ধা। আমি চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল।
হঠাৎ মনে পড়ল – সাগরের ছোটবেলায় আমি কখনোই তার প্রস্রাব কিংবা পায়খানা পরিষ্কার করার সুযোগ পাইনি। সংসারের বাস্তবতায় সেই দায়িত্ব তার মা একান্তই পরম মমতা ও দরদ দিয়ে নিজ হাতেই করতো। কিন্তু আজ সেই সন্তানই আমার বার্ধক্যের অসহায় মুহূর্তে একটুও বিরক্ত না হয়ে, একটুও ঘৃণা না করে, আমার সমস্ত নোংরা নিজ হাতে অত্যন্ত আন্তরিকতা, মমতা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে পরিষ্কার করছে। সেদিন আমি উপলব্ধি করলাম – রক্তের সম্পর্ক মানুষকে জন্ম দেয়, কিন্তু মহত্ত্বের পরিচয় দেয় চরিত্র।
সেই রাত থেকেই আমি সাগরকে শুধু ছেলে হিসেবে দেখি না। আমি তাকে ডাকি, “সাগর আব্বু” বলে।
কারণ, সে সেদিন আমার প্রতি যে মমতা, যে দায়িত্ববোধ, যে বিনয় এবং যে ভালোবাসার পরিচয় দিয়েছিল – তা একজন দায়িত্ববান পিতার ভালোবাসার চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না।
আমার জন্মদাতা পিতা ২০০০ সালের ২২ নভেম্বর পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু আল্লাহ যেন তাঁরই স্নেহের একটি অংশ আমার সন্তানের হৃদয়ে রেখে দিয়েছেন।
আজও সাগর প্রতি মাসের প্রথম দিনেই আমাদের প্রয়োজনের সব দায়িত্ব নীরবে পালন করে চলেছে। কখনো তাগাদা দিতে হয় না, কখনো অবহেলা দেখতে পাই না। আমাদের সুখদুঃখ, প্রয়োজন এবং অপ্রয়োজন – সবকিছুর খবর সে নিজের দায়িত্ব মনে করেই সঠিকভাবে পালন করে থাকে।
সম্প্রতি সে আবার আমাদের জন্য কাতার এয়ারওয়েজের টিকিট পাঠিয়েছে। আমি ও আমার স্ত্রী কয়েক দিনের মধ্যেই আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি’তে তাদের কাছে যাচ্ছি। ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতে গিয়েই হঠাৎ সেই ২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রাতের স্মৃতি আবার হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ল।
আজও মনে হয় – সেদিন যদি আল্লাহ আমাকে সেই অসহায় পরিস্থিতিতে না ফেলতেন, তাহলে হয়তো আমি কোনো দিনই জানতে পারতাম না, আমাদের সন্তান বিশ্বের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা গবেষণাগারের বিজ্ঞানী হয়েছে সত্য, কিন্তু সাগর যে সত্যিকার অর্থেই মানুষের মতো মানুষ হয়েছে – সেটাও সেদিন জানতে পেরেছি।
আমি আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে শুধু এই দোয়াই করি – হে আল্লাহ, আমাদের সাগর আব্বু ও তার পরিবারের সকল সদস্যকে সুস্থ রাখুন, দীর্ঘায়ু দান করুন, ঈমান, জ্ঞান ও মানবিকতায় আরও সমৃদ্ধ করুন। পৃথিবীর প্রতিটি মা-বাবার ভাগ্যে যেন সন্তানের অকৃত্রিম ভালোবাসা জোটে। কারণ, যে ঘরে এমন সন্তান থাকে, সে ঘরে বার্ধক্য কখনো বোঝা হয় না – সেখানে বার্ধক্য হয়ে ওঠে ভালোবাসার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান
| Sun | Mon | Tue | Wed | Thu | Fri | Sat |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | |||
| 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 |
| 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 |
| 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 |
| 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | |