admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২:৩০ অপরাহ্ণ
ভোটযুদ্ধের আগে মনোনয়নযুদ্ধ: ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে মনোনয়ন লড়াই জমে উঠছে। উত্তরে বিএনপির এবং দক্ষিণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করায় রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন চোঁখের জলে নিজের কঠিন সময় জানান দেয়ায় আওয়ামী লীগের মনেনায়নে নতুন মুখের আভাস পাচ্ছেন জনসাধারণ। অন্যদিকে, উত্তরে বিএনপি আগের প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে মনোনয়ন লড়াইয়ে ফের নেমেছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। সব মিলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নের চূড়ান্ত পরিণতি জানতে শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কৌতূহলীদের। কারণ, এদিন বড় দুই দলই তাদের মেয়রপ্রার্থী ঘোষণা করবে।
বুধবার ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, হাজি মো. সেলিম, এমএ রশিদ, মো. নাজমুল হক ও জামান ভূইয়া মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। হেভিওয়েট এসব নেতার মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর অনেকে ভাবতে শুরু করেছিলেন, গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়ায় দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন মনোনয়ন চাইবেন কিনা। কিন্তু তা হয়নি। বৃহস্পতিবার দুপুরে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। মনোনয়ন ফরম তুলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন দক্ষিণের নগর পিতা। বক্তব্যের একপর্যায়ে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে।
ডিএসসিসি মেয়র বলেন, ‘আপনাদের প্রিয় নেতা মেয়র মোহাম্মদ হানিফ আমার বাবার হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছি। আজ আমার বাবা নেই। আমি বাবাকে হারিয়েছি। বাবার অবর্তমানে আমার নেত্রী শেখ হাসিনা আমার অভিভাবক। তিনি আমার জন্য যা ভালো মনে করবেন, তিনি সেটাই করবেন। গত সাড়ে চার বছরে ঢাকা শহরের ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন উলেস্নখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকাবাসীর সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে পাশে ছিলাম। আজকে আমার রাজনৈতিক জীবনের একটা কঠিন সময়। এই কঠিন সময় আমার ঢাকাবাসীকে আহ্বান জানাই, প্রিয় ঢাকাবাসী আমার জন্য একটু দোয়া করবেন।
এ কথা বলতে বলতে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন তিনি। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাঈদ খোকন বলেন, প্রিয় দেশবাসী আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যাতে আপনাদের সুখে-দুঃখে যেভাবে ছিলাম, সেভাবে থাকতে পারি। অনেক কাজ করেছি, কিছুটা কাজ বাকি আছে। আমি যাতে এই কাজগুলো শেষ করে যেতে পারি। এই কঠিন সময় প্রিয় ঢাকাবাসী, দেশবাসী যদি আমার পাশে দাঁড়ায়, আমি আগামী পাঁচ বছর আপনাদের পাশে থাকব।
এদিকে বুধবার বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদুলস্নাহ ওসমানী ও ভাষাণটেক থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) ইয়াদ আলী সরকার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রপদে মনোনয়ন নেন। আর গতকাল এই পদে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন আওয়ামী লীগ নেতা কুতুব উদ্দিন নান্নু। তিনি নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর পদেও মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে আওয়ামী লীগ।
বিএনপি: মেয়রপদে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হতে উত্তরে আসাদুজ্জামান রিপন ও তাবিথ আউয়াল এবং দক্ষিণে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছ থেকে এই ফরম সংগ্রহ করেন তারা। আসাদুজ্জামান রিপন বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। তাবিথ আউয়াল বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছোট ছেলে। ২০১৫ সালে উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ইশরাক মহানগর বিএনপির সদস্য। দলের সদ্যপ্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে দক্ষিণের প্রার্থী ইশরাক সাংবাদিকদের বলেন, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন বৃহত্তর আন্দোলনের অংশগ্রহণ হিসেবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করার জন্য এবং বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি থাকবে, তাদের যে সাংবিধানিক অধিকার দেয়া হয়েছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের করার উনারা যাতে সেই পবিত্র দায়িত্বটা পালন করেন।
জয়ের ব্যাপারে কতটুকু আশাবাদী জানতে চাইলে তিনি বলেন, শতভাগ আশাবাদী, যদি একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে।
উত্তরের প্রার্থী আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, এই নির্বাচন থেকে প্রত্যাশা করার কিছু নেই। দেশে অনেক আগে থেকে ভোট নির্বাসিত হয়ে গেছে, দেশে গণতন্ত্র নেই, ভোট নেই, সুষ্ঠুভাবে কোনো নির্বাচনও হয়নি, যা হয়েছে যোতচুরিভাবে নির্বাচন হয়েছে। এরপরও বিএনপি গণতন্ত্র রক্ষার নামে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা হবে, গণতন্ত্র উদ্ধার হবে। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এই নির্বাচনে হারলে আকাশ ভেঙে পড়বে না। আসলে আকাশ ভেঙে পড়বে তাদের (সরকার) মাথায়। সে জন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন কোনোভাবে নিরপেক্ষ হোক- এটা তারা চাইবে না।
তিনি বলেন, বিএনপি ভোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনগণকে সংগঠিত করার জন্য এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিকে তরান্বিত করার জন্য। উত্তরের অপর প্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেন, জাতির কল্যাণে কাজ করার জন্য জনগণের সব অধিকার রক্ষা করার জন্য প্রতিদিন প্রস্তুত থাকেন। সেই প্রস্তুতির অংশহিসেবে, আন্দোলনের অংশহিসেবে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। এবার একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, যদি তা হয়, শুধু জয়লাভ করবেন।
উত্তরের জনগণ কাকে ভোট দেবে জানতে চাইলে তাবিথ বলেন, জনগণ ধানের শীষকে ভোট দিবে, বিএনপিকে ভোট দেবে, কারণ বর্তমান পরিস্থিতি এটা শুধু ঢাকাবাসী নয়, সারা বিশ্ববাসী দেখছে। ঢাকা একটা দূষনের শহরে পরিণত হয়েছি, নিরাপত্তার ব্যাপারেও সবচেয়ে নিম্নস্থানে রয়েছে, বাসযোগ্য শহরের ব্যাপারে ঢাকা সবচেয়ে নিম্নস্থানে রয়েছে। এই শহরের সঙ্গে তুলনা হচ্ছে, যেসব দেশে যুদ্ধ চলছে। তিনি নিজেকে শুধু যোগ্য প্রার্থী ভাবছেন না। জনগণের প্রার্থীও ভাবছেন। কারণ, ২০১৫ সালের নির্বাচনে পরিষ্কারভাবে জনগণের ব্যাপক সাড়া তার প্রতি এসেছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনটা বানচাল করে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে পুরো দেশের জনগণ চেষ্টা করেছিল ধানের শীষের ওপর আস্থা রাখতে এবং ভোটটা দিতে। সেটাও ২৯ তারিখে ভোট ডাকাতি করে নিয়ে গেছে। তাই শুধু আশাবাদীই নন, দেশবাসী এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ভোটাররা যদি চান্স পায়, তাহলে তাকেই ভোট দেবে।
ইভিএম নিয়ে কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিন প্রার্থী। ইভিএম যারা পরিচালনা করবে, সেখানে দলীয় এজেন্ট নিয়োগ রাখার বিধানের দাবিও জানান তারা। বিএনপির মেয়র ও কাউন্সিলর পদের মনোনয়নপত্রের সংগ্রহ মূল্য রাখা হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। মেয়রপদে মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমা আজ বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে। শনিবার গুলশান কার্যালয়ে বিকালে দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় দুই মেয়রপ্রার্থী চূড়ান্ত হবে।
জাতীয় পার্টি
এ পর্যন্ত মেয়রপদে ঢাকা দক্ষিণের আলমগীর শিকদার লোটন ও হাজি সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক জাপার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে জাতীয় পার্টির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৫১ জন। এর আগে বুধবার থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে দলটি।
সিপিবির মেয়রপ্রার্থী উত্তরে রুবেল, দক্ষিণে মানবেন্দ্র।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ঢাকা উত্তরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. সাজেদুল হক রুবেল এবং দক্ষিণে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মানবেন্দ্র দেবনাথের নাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঢাকা জেলা কমিটি।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর পল্টনে সিপিবি কার্যালয়ের মুক্তি ভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই দুইজনের নাম ঘোষণা করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সিপিবি নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি চারটি লিখিত দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, মেয়র নির্বাচনে যে জামানতের টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা একজন সৎ রাজনীতিবিদের পক্ষে দেয়াটা কঠিন। মেয়রপদে জামানতের টাকা ১০ হাজার এবং কাউন্সিলর পদে পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করার দাবি করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে চূড়ান্তভাবে সিপিবির মেয়রপ্রার্থী নির্বাচন করা হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উলেস্নখ করা হয়।
প্রসঙ্গত, ঢাকা বিভক্তির পর ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল দুই সিটিতে একযোগে নির্বাচন হয়। নির্দলীয় সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে উত্তরে আনিসুল হক এবং দক্ষিণে সাঈদ খোকন মেয়র নির্বাচিত হন। আনিসুল হকের মৃতু্যর পর বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের বর্জনের মধ্যে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম মেয়র নির্বাচিত হন। উপনির্বাচনের আগে আইন সংশোধন হওয়ায় সেই নির্বাচনটি হয় দলীয় প্রতীকে। আগামী ৩০ জানুয়ারি রাজধানীর এই দুই সিটিতে নির্বাচন হবে। দলীয় প্রতীকের মেয়র নির্বাচন, মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে।