admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ মার্চ, ২০২০ ১২:২৫ অপরাহ্ণ
একদলীয় শাসনের চীনের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক দেশগুলো কী শিখতে পারে? ইটালি সারা দেশে আটকাবস্থা জারি করেছে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জানুয়ারিতে যখন চীন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে যে তারা অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, তখন অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন যে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে একই ধরণের পদক্ষেপ নেয়া কঠিন হবে। চীনের নেয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল ৫ কোটি ৬০ লাখ নাগরিকসহ পুরো হুবেই প্রদেশকে কোয়ারেন্টিন করে ফেলা এবং সংক্রমিতদের চিকিৎসার জন্য ১০ দিনের মধ্যে হাসপাতাল তৈরি করা। আর তারপর থেকেই চীনে প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে পরের দুই সপ্তাহে বাকি বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব ১৩ গুণ বেড়েছে। করোনাভাইরাসকে মহামারি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস ঘেব্রেয়েসাস দেশগুলোকে ‘জরুরি এবং আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে’ আহ্বান জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিক দেশগুলো করোনাভাইরাস মোকাবেলায় চীন থেকে কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করলো? দক্ষিণ কোরিয়ার মত যুক্তরাষ্ট্রও গাড়ির ড্রাইভারদের পরীক্ষা করছে ।

চীন: ভয়াবহতা কতটুকু কেটেছে?
১০ই মার্চ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র উহান সফর করেন, যার মাধ্যমে জাতীয় জরুরি অবস্থা শেষ হওয়ার একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী করোনাভাইরাসে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা অল্প কিছু মানুষে নেমে এসেছে। তবে নিউ ইয়র্কের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’র বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ইয়ানঝোং হুয়াং জানায় যে, চীনের অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য কোনো জায়গায় পুনরাবৃত্তি করা কঠিন।গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক যে কোন দেশের জন্যই এরকম একটা উদাহরণ তৈরি করা যথেষ্ট কঠিন। সমাজের মানুষের মধ্যে এরকম ব্যাপক ও কার্যকরভাবে প্রভাব বিস্তার করা খুবই কঠিন। কিছু গণতান্ত্রিক নেতা চীনের উদাহরণ অনুসরণ করতে চাইলেও তাদের সেই ক্ষমতা বা সমাজের ওপর কর্তৃত্ব, কোনোটাই নেই।
হুবেই প্রদেশে ভ্রমণ বাতিল করার পর চীনে ৫ কোটির বেশি মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় স্বৈরশাসকের প্রয়োজন নেই চীনের উদাহরণ যেমনই হোক না কেন, ইতালির মিলান শহরের ভিতা-স্যালুট সান রাফায়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলোজি ও ভাইরোলোজির অধ্যাপক ডক্টর রবার্টো বুরিয়ানি মনে করেন করোনাভাইরাস মোকাবেলা করতে স্বৈরশাসকের প্রয়োজন নেই। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ইটালি। নিজেদের জনসংখ্যার ৬ কোটি মানুষকে আটক অবস্থায় রেখেছে তারা। খাবার ও ওষুধের দোকান বাদে অন্যান্য সব ধরণের দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছে। জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। যারা বাইরে ভ্রমণ করছেন তাদের কাছে ভ্রমণের কারণ ব্যাখ্যা করে জরুরি নথিপত্র দেখা হচ্ছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ড্কটর বুইরানি টুইটারে পোস্ট করেছেন বাস্তবে একনায়কতন্ত্র চলছে। ভাইরাসটি হলো স্বৈরশাসক, যে মানুষের মধ্যে থেকে চুম্বন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, সঙ্গীতানুষ্ঠান কেড়ে নিয়েছে। আমাদের প্রত্যেকের নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। বিজয়ের মুহুর্তটি নিশ্চয়ই সুন্দর হবে।

ইটালির উত্তরাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দ্রুততার ওপর নির্ভর করছে সব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সিনিয়র উপদেষ্টা ডাক্তার ব্রুস এলওয়ার্ড মনে করেন জাতীয়ভাবে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তা দিয়ে যাচাই করা সম্ভব নয় যে কোন দেশ কতটা গণতান্ত্রিক এবং কোন দেশ স্বৈরশাসক নিয়ন্ত্রিত। হুবেইয়ে তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধান করতে যাওয়া একটি দলের সাথে ছিলেন ডক্টর এলওয়ার্ড। তিনি মনে করেন চীনের কাছ থেকে এখনো শিক্ষাগ্রহণ করতে পারেনি বাকি বিশ্ব। তিনি বলেন, চীন থেকে আমার যা শিখতে পারি তা হলো দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ নেয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সংক্রমণকারীর বিরুদ্ধে আপনি লড়াই করতে পারবেন যদি রোগ শনাক্তের ক্ষেত্রে, আক্রান্তদের আলাদা করায় এবং তাদের কাছের লোকজন খুঁজে বের করে তাদেরও আলাদা করার কাজগুলো খুবই দ্রুততার সাথে করতে পারেন। মানুষকে বুঝতে হবে আমরা কাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। তাদের পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে হবে এবং সরকারের নেয়া পদক্ষেপকে সফল করতে সরকারকে সহায়তা করতে হবে। ডক্টর এলওয়ার্ড মনে করেন সাধারণ চীনা নাগরিকরা জরুরি মুহুর্তে স্বপ্রণোদিত হয়ে একজোট হয়ে ভাইরাস মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চীনের মানুষ সরকারকে ভয় পায়নি, তারা ভাইরাসকে ভয় পেয়েছে। তাদের ভয় ছিল একজোট হয়ে ভাইরাসের মোকাবেলা করতে না পারলে তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। দিক নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে সরকার অবশ্যই একটি বড় ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু আসল কাজটা সম্পন্ন করেছে সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে।
উহানে শি জিনপিংয়ের সফরের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে চীনে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সমাপ্তি হয়েছে ভাইরাসের সম্ভাব্য বাহক খুঁজে বের করা দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ আগ্রাসীভাবে ভাইরাসের মোকাবেলা করেছে। মানুষজনকে অবরুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়েনি তাদের। চীন, ইতালি ও ইরানের পর সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী দক্ষিণ কোরিয়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ মোবাইল ফোন এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাস্তাঘাটে পরীক্ষা করছে যেন ভাইরাসের সম্ভাব্য কোনো বাহক ভাইরাস বহন করে যেতে না পারে। প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন এই পরিস্থিতিকে যুদ্ধের সাথে তুলনা করেছেন। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি – যা ইটালির সাথে তুলনা করা যায় – তবে ইটালির চেয়ে ৩০ হাজার কম মানুষ সেখানে কোয়ারেন্টিনে রয়েছে। এছাড়া তাদের দেশে নতুন সংক্রমিতদের সংখ্যাও দ্রুতহারে কমছে। যে পরিমাণ নতুন আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছে সেখানে, তার চেয়ে বেশি রোগী প্রতিদিন সুস্থ হয়ে ছাড়া পাচ্ছে। অধ্যাপক হুয়াং মনে করেন যে শুধু মানুষকে আটকে রাখাই নয়, সরকার দেশের অর্থনীতিও রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তিনি মন্তব্য করেন যে চীনের নেয়া কয়েকটি পদক্ষেপের কারণে পরে সমস্যাও তৈরি হয়েছিল। উহানে স্বাস্থ্য সেবা দিতে একসাথে প্রচুর হাসপাতাল তৈরি করায় এবং চীনের বিভিন্ন স্থান থেকে সেখানে চিকিৎসক নিয়োগ দেয়ায় শহরে কিছু সময়ের জন্য মৃত্যুর হার বেড়ে গিয়েছিল।

অন্যান্য দেশ কী করছে?
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে ২৬টি ইউরোপিয়ান দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে আসার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শেনজেন বর্ডার ফ্রি ভ্রমণে অধিভুক্ত দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় তার যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকার বিষয়টি অস্বীকার করায় সিনিয়র ডেমোক্র্যাটরা তার সমালোচনা করেছেন। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জর্জটাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ টুইট করেছেন: ইউরোপের অধিকাংশ অংশই যুক্তরাষ্ট্রের মতই নিরাপদ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে লাভবান হবে না। জীবাণু সীমান্তের ধার ধারে না। এছাড়া ইরানের সমালোচনা করা হয়েছে তাদের দেশে ভাইরাসের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হওয়া কোম প্রদেশের পুরোটা কোয়ারেন্টিন না করার কারণে। ইরানের সরকার মেডিক্যাল চেকপয়েন্ট তৈরি করেছে এবং তাদের নাগরিকদের ভ্রমণ করতে নিষেধ করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া বদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি না করলেও গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় টেস্ট করার ব্যবস্থা করেছে সৌদি আরবের যে অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোগী শনাক্ত করা গেছে, সেই কাতিফ প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এপ্রিল পর্যন্ত সব স্কুল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে জাপান। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশে একই ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী ২৯টি দেশে ৩৩ কোটি শিশু ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের প্রভাব পড়ছে ৬ কোটি শিক্ষার্থীর ওপর। তবে ইউরোপের সব দেশ ইটালির মত শক্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে না এখনই। ইটালি ফেরত নাগরিকরা যেন ১৪দিন নিজেদের স্বেচ্ছায় আলাদা করে রাখে, ব্রিটিশ সরকার নাগরিকদের সেই অনুরোধ করেছে। বাধ্যতামূলক আইসোলেশনের জন্য আইনও তৈরি করা হয়েছে তবে এখনই স্কুল বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয় তারা। 
সৌদি আরব কাতিফ প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে কেন্দ্রীয় সমন্বয় ব্রিটিশ সরকার ধারণা করছে যে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে, তবে ইংল্যান্ডের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার জেনি হ্যারিস মনে করেন এর জন্য দেশ প্রস্তুত রয়েছে। ব্রিটিশ ও ইটালিয়ান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনেকটা অঞ্চল কেন্দ্রিক, তাই পুরো দেশজুড়ে ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট মানের সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের একটু সময় লেগেছে। আমাদের পুরো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি একটিই, যেটি সরকারের সহায়তায় পরিচালনা করা হয়।। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান মন্তব্য করেছেন যে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং সব দেশের সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন নিজেদের দেশের চাহিদা অনুযায়ী আলাদা আলাদা পদক্ষেপ নেয়।