admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০২০ ৯:২৬ অপরাহ্ণ
মুক্ত কলম বক্স অফিস সিঙ্গাপুরঃ যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন রিপাবলিক অব সিঙ্গাপুর এর, তখন জনগণের মাথাপিছু বাৎসরিক আয় ছিলো মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার। সেখান থেকে লি কুয়ান ইউ এর প্রধানমন্ত্রীত্বের শেষ বছর ১৯৯০-এ তা দাঁড়ায় সাড়ে ১৪ হাজার মার্কিন ডলারে, প্রায় ২,৮০০% উন্নতি! বর্তমানে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৩ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৫ লক্ষ বাংলাদেশি টাকা)। বিশ্বে সম্ভবত সিঙ্গাপুরই একমাত্র দেশ, যার একটি গোটা প্রজন্ম নিজ দেশকে তৃতীয় বিশ্ব থেকে প্রথম বিশ্বে উন্নীত হতে দেখেছে চর্মচক্ষে। দেশটি একেবারেই ছোট, মাত্র ৭১২ বর্গ কিলোমিটার। নেই প্রাকৃতিক সম্পদও। কিন্তু লির চোখে উচ্চাকাঙ্ক্ষার কমতি ছিলো না। শুরুতেই তাই হাত দিলেন পরিকল্পিত নগরায়ন আর উন্নত অবকাঠামো বিনির্মাণে। হাউজিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ গঠন করে লি কুয়ান ইউ সর্বপ্রথম সিঙ্গাপুরবাসী প্রত্যেকের জন্য সরকারি আবাসন নিশ্চিত করেন। তার ধারণা ছিলো, এ শহরে যখন কেউ একটি বাড়ির মালিক হবে, শহরটির ব্যাপারে দায়িত্ব ও মমত্ববোধ তার আরো বেশি করে সৃষ্টি হবে, যা এগিয়ে নেবে সিঙ্গাপুরকে।
দেশ গড়ার কাজে শুরুতেই যে জিনিসটি দরকার তা হলো জাতিগত ঐক্য। কিন্তু সিঙ্গাপুর ছিলো নানা ধর্ম-বর্ণ-জাতির দেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ চীনা বংশোদ্ভূতের সাথে বৃহৎ সংখ্যক মালয় ও ভারতীয়। এদের মাঝে দাঙ্গা-ফ্যাসাদ লেগেই থাকতো। ক্ষমতা নেওয়ার কয়েক বছরের মাথায় এ সমস্যার সমাধান করে ফেললেন লি। সরকারি আবাসনের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি আরোপ করে সম্প্রদায়সমূহের মাঝে বৈষম্য কমালেন তিনি। সেই সাথে যেকোনো রকম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী উসকানির বিরুদ্ধে রাখলেন কঠোর আইন ও কঠোরতর প্রয়োগ।
শিল্প স্থাপনের পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গাও ছিলো না দেশটিতে, কেননা তা বেজায়ই ছোট আয়তনের। এটি যেমন ছিলো অসুবিধা, তেমনি সুবিধা। সুবিধা এই অর্থে যে, ছোট একটি দেশ বলে একে সবুজ-পরিপাটি বানিয়ে বিনিয়োগকারীর দৃষ্টি আকর্ষণও সোজা। লি সেই সুযোগটাই নিলেন। প্রকৃতিপ্রেমী লি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন শহর বিনির্মাণে দিলেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব। এ লক্ষ্যে বানালেন ‘গার্ডেন সিটি অ্যাকশন কমিটি’। রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ গাছ তো বটেই, পুরো সিঙ্গাপুরের দশভাগ জায়গা জুড়ে আছে কেবল পার্কই। বর্জ্য-ব্যবস্থাপনায় এতটাই কড়াকড়ি যে, দেশটিতে চুইংগাম খাওয়াই নিষিদ্ধ। কেন সিঙ্গাপুর বিশ্বের ‘পরিচ্ছন্নতম দেশ’, সেটা বুঝতেই পারছেন।
পুরো শহরের অবকাঠামো ঢেলে সাজালেন। কেবল আকাশচুম্বী অট্টালিকার ঝোপ তিনি বানাননি। প্রতিটি অট্টালিকার সাথে রেখেছেন খেলার মাঠ, বিনোদনের উপযোগী জায়গা। ছোট্ট একটা দেশ; লাখ লাখ প্রাইভেট কার চললে দুদিনে দেশের রাস্তা হবে অচল। তাই তিনি চেয়েছেন উন্নত গণপরিবহনব্যবস্থা। শুরুতে বাস-সুবিধাই উন্নত করবার কথা ভেবেছিলেন। পরে দেখলেন, কিছুটা বেশি খরচ করে রেল-অবকাঠামো উন্নত করলে বাস-ব্যবস্থাও আপনাতেই উন্নত হয়ে যায় এবং রাস্তায় যানজট সমস্যার সমাধান হয়। ব্যস, রেলখাতও ঢেলে সাজালেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে এত টাকা সিঙ্গাপুর তখন কোথায় পেলো, যা দিয়ে এমন অভূতপূর্ব অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব? উত্তরটা নিহিত ১৯৭৩ এর এক ঘটনায়। সে বছর আমেরিকা যখন ডলারের সাথে স্বর্ণমজুদ ব্যবস্থার সম্পর্কচ্ছেদ করে, তখন তার চূড়ান্ত ফায়দা নেন লি কুয়ান ইউ। বিশ্বব্যাপী মুদ্রা বিনিময় বাজারের শীর্ষস্থান হিসেবে উঠে আসে সিঙ্গাপুর। এশিয়ায় ডলারের বাজার তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হংকংকে ছাড়িয়ে যায় সিঙ্গাপুর। সেই সঙ্গে মার্কিনঘেঁষা নীতি ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতি অনুরাগের জন্য মাথার ওপর ছিলো বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর আশীর্বাদ।
মন্ত্রী-আমলা ও সরকারি চাকুরেদের বিশাল অঙ্কের বেতন প্রদান করা শুরু করেন লি, যাতে তারা ঘুষও না খান, আন্তরিকতা নিয়ে দায়িত্বও পালন করেন, এবং সর্বোপরি সরকারের ওপর সদা তুষ্ট থাকেন। নিজে ছিলেন প্রচণ্ড সৎ ও কঠোর একজন নেতা। তার চাপে পড়েই কি না, সিঙ্গাপুরের সরকারি ব্যবস্থার অভিধান থেকে দুর্নীতি শব্দটি হারিয়ে গেলো। তাঁকে রীতিমত ভয় পেত প্রশাসনের সবাই।
যখন ক্ষমতায় এলেন দেশটির, সিঙ্গাপুর ছিলো কেবল ঝিমিয়ে থাকা এক সমুদ্র বন্দর। তবে ভৌগোলিক অবস্থানটি অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে যে বেশ লোভনীয়, তা বুঝেছিলেন লি। তাই উন্নয়নের বড় হাতিয়ার করতে চাইলেন এই দিকটিকে। ঢেলে সাজালেন সিঙ্গাপুরের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে। অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাপ্রদানসহ পর্যটক-আনুকূল্যে যা যা করা দরকার সব করেছেন। ফলাফলও এলো হাতেনাতে। অল্প সময়েই সিঙ্গাপুর পরিণত হলো এয়ারলাইন্স গুলোর ট্রানজিট হাবে। দূরবর্তী ফ্লাইটের যাত্রীরা এখন ট্রানজিট হিসেবে সিঙ্গাপুরকেই বেছে নেন, যদিও দুবাইয়ের সাথে এখন ভালোই টক্কর দিতে হয় তাকে। এভাবে বিমানসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সদর দপ্তর বনতে শুরু করলো সিঙ্গাপুর। ওদিকে সাংহাইয়ের পর সিঙ্গাপুরই বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর।
এভাবে আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে শক্ত আবির্ভাবের পর সিঙ্গাপুর পরিণত হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ারই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হাবে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহ দলে দলে বেছে নিতে থাকলো সিঙ্গাপুরকে। কারণ? রাজনৈতিক গোলযোগ নেই, যোগাযোগব্যবস্থা চমৎকার, কর খুবই অল্প, সরকারও আন্তরিক শিল্পপতিদের প্রতি, অবকাঠামো আর পরিবেশ তো অতুলনীয়। বর্তমানে গুগল, ফেসবুক, শেভরন, টয়োটা, পেপসিকো সহ এমন কোনো বৈশ্বিক কোম্পানি নেই, যারা সিঙ্গাপুরে আঞ্চলিক সদরদপ্তর খোলেনি।
জীবন সায়াহ্নের শেষ কয়টি দিন নিউমোনিয়ায় ভুগে ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ ৯১ বছর বয়সে মারা যান লি কুয়ান ইউ। কুয়ান ইউ অর্থ উজ্জ্বল আলো। বিতর্ক সত্ত্বেও নেতা লি কুয়ান ইউকে জাতির ইতিহাসে উজ্জ্বল আলো না মানার মতো এতটা অকৃতজ্ঞও সিঙ্গাপুরিয়ানরা নন।