admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২০ ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ
চাবাহার বন্দরে ভারতের রেল প্রকল্প হাতছাড়া হওয়ার পেছনেও ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হচ্ছে আফগানিস্তানের রপ্তানি চালান। ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ কি চীনের ভূমিকা? ইরানের চাবাহার বন্দরের সঙ্গে প্রাদেশিক রাজধানী জাহেদানকে সংযুক্ত করবে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল প্রকল্প থেকে ইরান ভারতকে সরিয়ে দেওয়ার পর দিল্লির এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ইরান বলছে, এই প্রকল্পে ভারতের অর্থায়নের জন্য তারা আর অপেক্ষা করতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে ইরানের সম্প্রতি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দিল্লিতেও পর্যবেক্ষকরাও অনেকেই মনে করছেন, ভারতের তৈরি চাবাহার বন্দরেও এখন চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হল। বিরোধী দল কংগ্রেসও এই ইস্যুতে সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছে।
ইরানের উপকূলে যে চাবাহার বন্দর নির্মাণে ভারত খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সেটি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় স্থলপথে অ্যাকসেসের জন্য ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। বছর চারেক আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইরান সফরের সময় তিনি আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সঙ্গে মিলে তেহরানের সঙ্গে যৌথভাবে একটি চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেন, যাতে চাবাহার থেকে আফগানিস্তানের জারাঞ্জ পর্যন্ত রেল ও সড়কপথে পরিবহন করিডর নির্মাণের দায়িত্ব পায় ভারত। চাবাহার পরিবহন করিডর চুক্তি সই করার সময় ইরান, ভারত ও আফগানিস্তানের নেতারা। মে, ২০১৬ কিন্তু চার বছর পরেও সে কাজে বিশেষ অগ্রগতি না-হওয়ায় ইরান এখন নিজেরাই জাহেদান পর্যন্ত ওই রেলপথের সোয়া ছশো কিলোমিটার বানাবে বলে ঘোষণা করেছে। মালাক্কা ডিলেমা’ কাটাতে চাইছে চীন? ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহার কথায়, বিদেশে ভারতীয় সংস্থাগুলোই কখনওই তাদের প্রকল্প ঠিক সময়ে শেষ করতে পারে না, এই অভিযোগ আমরা হামেশাই শুনি।
এখানেও ইরকন নামে যে সংস্থাটি দায়িত্ব পেয়েছিল, তারাও নানা কারণে যন্ত্রপাতি পাচ্ছিল না আমরা জানি। তবে ইরান যে সাহস করে নিজেরাই এর রূপায়নে এগিয়ে এসেছে, তার পেছনে অবশ্যই চীনের ভরসা আছে। চাবাহারের কাছে চীন একটি রিফাইনারিও বানাচ্ছে, ইরানের তেল সেখানে পরিশোধন করে পাইপলাইনে গোয়াদর বন্দরে নিয়ে এসে সেখান থেকে পাকিস্তান হয়ে তারা নিজেদের দেশে আনতে চায়। জ্বালানির জন্য মালাক্কা প্রণালীর ওপর চীনের যে নির্ভরতা, যেটাকে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ বলা হয়, সেটা কাটানোর জন্য অবশ্যই তারা এটাকে একটা উপায় হিসেবে দেখছে, বলছিলেন সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তা।

চাবাহার বন্দরঃ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও কার্যত মেনে নিচ্ছেন, চাবাহারে ভারত বিপুল পরিমাণ লগ্নি করার পরও এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হয়তো শেষ পর্যন্ত চীনের কাছেই হাতছাড়া হয়ে যাবে।
মি. চক্রবর্তীর কথায়, ইরান বলছে ওই রেল প্রকল্পে ভারত ঠিক সময়ে টাকাপয়সা দেয়নি। আমরা যেটা দেখছি, চাবাহার নিয়ে ভারতের মধ্যেও এখন একটা দ্বিধা কাজ করছে – কারণ ওই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমার ধারণা চাবাহার বন্দর প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত ভারতেরও শেয়ার থাকবে কিন্তু চীনই শেষ পর্যন্ত ওখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার হিসেবে উঠে আসবে।
সেক্ষেত্রে একদিকে চাবাহার আর সোয়াশো মাইল দূরে পাকিস্তানের গোয়াদর, দুটো বন্দরের নিয়ন্ত্রণ তারা কীভাবে সামলায়, সেটাও দেখার বিষয় হবে। ওদিকে ইরানের সমস্যা হল স্যাংশন আরোপ হওয়ার আর্থিকভাবে তাদের অবস্থা খুবই খারাপ, তারাই বা ভারতের টাকাপয়সার জন্য কতদিন অপেক্ষা করবে? বস্তুত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে বিপদের মুখে পড়া ইরান এখন কম দামে চীনকে তেল বিক্রি করছে, সম্প্রতি চীনের সঙ্গে চারশো বিলিয়ন ডলারের স্ট্র্যাটেজিক সমঝোতাও করেছে তারা।
ভারতেরহিন্দুত্ববাদীদের নিয়ে ক্ষুব্ধ ইরান? দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজের ফেলো অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী মনে করিয়ে দিচ্ছেন, চীন ও ইরানের সম্পর্ক কিন্তু বরাবরই খুব ভাল। ডঃ চক্রবর্তী বিবিসিকে বলছিলেন, বিশেষত ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত চরমে উঠেছে, চীন খুব ভালভাবেই তার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে। এখন চাবাহার রেল প্রকল্প থেকে ভারতকে সরানোয় চীনের ভূমিকা আছে কি না তা বলা মুশকিল, থাকলেও থাকতে পারে। তবে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তেহরান দিল্লির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল, সেটা তারা পায়নি তাতেও কোনও ভুল নেই! তা ছাড়া হিন্দু মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়পড়তা ইরানিদের কাছে ভারতের যে ছবিটা তৈরি হয়েছে, দিল্লির দাঙ্গার পর ইরান যেভাবে ভারতের নিন্দা করেছে সে সব কিছুরও প্রভাব এখানে থাকতেই পারে, বল ছিলেন অধ্যাপক চক্রবর্তী। পাশাপাশি ভারত যে এখন আর ইরানের কাছ থেকে তেল কিনছে না, সেটাও ইরানের ক্ষোভের একটা কারণ হতে পারে বলে মনে করেন পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী।
আমরা এককালে ইরানের কাছ থেকে শস্তায় বহুদিন তেল কিনেছি। এখন যেহেতু আর কিনতে পারছি না, তাদের ক্ষুব্ধ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। অন্য দিকে চীন বলছে আমরা তোমাদের সব তেল কিনে নিতে রাজি, ফলে ইরানের তো চীনকে বেছে নেওয়া ছাড়া উপায়ও নেই, বলছিলেন তিনি। ভারতে বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভিও টুইটারে অভিযোগ করেছেন, চীন তুলনায় অনেক ভাল ‘ডিল’ দিয়েছে বলেই চাবাহার প্রকল্প ভারতের হাতছাড়া হল। রেল প্রকল্পে এখন আর কিছু করা খুব কঠিন, এটা ধরে নিয়েই ভারতও এখন চাবাহার থেকে অফিগানিস্তান সড়ক সংযোগের প্রকল্পেই বেশি জোর দিতে চাইছে।