admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই, ২০২০ ১০:৩০ অপরাহ্ণ
প্রবন্ধটিঃ ভুবনেশ্বরী মন্দিরের পাথরের ঘাট গোমতী নদীতে গিয়া প্রবেশ করিয়াছে। ত্রিপুরার মহারাজা গোবিন্দ মানিক্য একদিন গ্রীষ্মকালের প্রভাতে স্নান করিতে আসিয়াছেন, সঙ্গে তাঁহার ভাই নক্ষত্ররায়ও আসিয়াছেন। এমন সময় একটি ছোট মেয়ে তাহার ছোট ভাইকে সঙ্গে করিয়া সেই ঘাটে আসিল। রাজার কাপড় টানিয়া জিজ্ঞাসা করিল -তুমি কে? রাজা ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন- মা আমি তোমার সন্তান।উপরোক্ত অংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত রাজর্ষি উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ থেকে গৃহীত হয়েছে। এই উপন্যাসের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন –স্বপ্নে দেখলুম, একটা পাথরের মন্দির। ছোট মেয়েকে নিয়ে বাপ এসেছেন পূজো দিতে। সাদা পাথরের সিঁড়ির উপর দিয়ে বলির রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। দেখে মেয়েটির মুখে কি ভয়! কি বেদনা? বাপ কে সে বারবার করুনস্বরে বলতে লাগল – এত রক্ত কেন? আসল গল্পটি ছিল প্রেমের অহিংস পূজার সঙ্গে হিংস্র শক্তি পূজার বিরোধ। ত্রিপুরার পটভূমিতে যৌবনে লেখা রাজর্ষি উপন্যাসের কাহিনী থেকে বিসর্জন নাটক রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ত্রিপুরা রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ভগ্নহৃদয় কাব্যগ্রন্থের জন্য ত্রিপুরার রাজপরিবার থেকে কবি রূপে জীবনের প্রথম পুরষ্কার পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে কাহিনী কাব্যগ্রন্থটি ত্রিপুরার রাজা রাধাকিশোর দেব মানিক্যকে উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

ভারতের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ত্রিপুরা তার শান্ত, সরল ও মনোরম পরিবেশের জন্য ভ্রমনের একটি আদর্শ স্থান রূপে বিবেচিত হয়ে থাকে। ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য হল ত্রিপুরা। এই রাজ্যের ইতিহাস মহাভারতের সময়কাল থেকে সূচিত হয়েছে। ক্ষুদ্র হলেও ত্রিপুরা অতীব সুন্দর একটি রাজ্য। পবিত্র বৌদ্ধও হিন্দু মন্দির,বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের আবাসস্থল এবং বিভিন্ন উপজাতিদের স্পন্দনশীল গঠনের সমন্বয়ে ত্রিপুরা অনাবিষ্কৃত সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে।ত্রিপুরাপাহাড়, পাহাড়ি জলধারা এবং সবুজ উপত্যকাদ্বারা পরিবেষ্টিত। ত্রিপুরার জনপ্রিয় পর্যটন স্থলগুলির মধ্যে অন্যতম হলো নীরমহল।
নীরমহল (২৩˚ ৫০ উঃ অঃ / ৯১˚ ৩১ পূঃ দ্রাঃ)ত্রিপুরাবাসীর গৌরবময় স্থাপত্য শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তির নিদর্শন। নীরমহল আসলে একটি জলমহল বা জলপ্রাসাদ।এই মহলটি ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ৫৩ কিলোমিটার দূরে অগ্নিকোণ (দক্ষিণ-পূর্ব) বরাবর সিপাহীজলা জেলার সোনামুড়া মহকুমায় স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বশেষ মহারাজ পঞ্চশ্রী বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।
মহারাজ দ্বারা নির্মিত উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য গুলির মধ্যে নীরমহল অন্যতম। গ্রীষ্মাবকাশ যাপনের জন্য মহারাজ এই মনোমুগ্ধকর মহলটি নির্মাণ করেছিলেন।তৎকালীন ব্রিটিশ আর্কিটেকচার কোম্পানি মার্টিন এন্ড বার্ন কে দিয়ে ত্রিপুরার মহারাজ এই স্বপ্নপুরী নির্মাণ করেছিলেন। স্রোতস্বিনী গোমতী নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টি করেছিলেন মহারাজ বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর। তাঁর সৃষ্ট জলাধারটির নামকরণ করেছিলেন রুদ্রসাগর।এই রুদ্রসাগরের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড মেলাঘর নামে পরিচিত। মেলাঘরের নয়নাভিরাম নৈসর্গিক রূপ পর্যটকগণকে মুগ্ধ করে। প্রকৃতির অকৃপণ হাতে সজ্জিত এই মেলাঘর। আয়তনে রুদ্রসাগর ৭ বর্গ কিলোমিটার। এই রুদ্রসাগরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ‘নীরমহল’ রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

৪০০ মিটার দীর্ঘ নীরমহল নির্মাণে প্রায় সাত-আট বছর সময় লেগেছিল। এত দিন সময় নিয়ে যে অপূর্ব স্থাপত্য তৈরি হয়েছিল, তা সত্যই এক অতুল কীর্তি। নীরমহলে ২৪টি কক্ষ রয়েছে। মূল প্রাসাদটি দু’ভাগে বিভক্ত। মহলের পূর্বাংশে রয়েছে মহারাজের দেহরক্ষী, পাইক, পেয়াদা ও সৈন্য-সামন্তদের কক্ষ আর পশ্চিমাংশে রয়েছে খাসমহল ও অন্দরমহল। মহারাজ ও মহারানীদের জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক কক্ষ। এছাড়াও রয়েছে প্রজাসাধারণের জন্য দর্শনার্থী কক্ষ, নাচমহল, স্নানাগার, ক্রীড়াকক্ষ এবং অস্থায়ী কোষাগার। অপর দিকে অন্দর মহলে রয়েছে রাজকুমার, রাজকুমারী এবং রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অবস্থানের জন্য ৬টি মনোরম কক্ষ ও সুসজ্জিত দরবার হল এবং রাজ অতিথিদের বিশ্রাম কক্ষ।রয়েছে একটি খোলা মঞ্চ। এই মঞ্চে প্রায়ই নাটক, নাচ ও গানের আসর বসত। এই স্থাপত্য শৈলীটি মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়।
নীরমহলের অভ্যন্তরে রয়েছে একটি সুবিশাল সবুজ গালিচা ও সুউচ্চ টহল গম্বুজ। গম্বুজের ভেতরে চক্রাকার ওপরে ওঠার সিঁড়ি, যা খুবই আকর্ষণীয় ও দর্শনীয়। গম্বুজের শিখরে টহল কক্ষ। মহারাজ যখন নীরমহলে অবস্থান করতেন, তখন রাজরক্ষীরা গম্বুজের শিখরে আরোহণ করে মহলের নিরাপত্তায় নিযুক্ত থাকতেন। মহারাজ ও মহারানীর মহলে প্রবেশের জন্য পৃথক দুটি সিঁড়ি অবস্থিত। সিঁড়িগুলি জলের তলা থেকে প্রাসাদ কক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত। অপরূপ কারুকার্যমণ্ডিত নকশাযুক্ত নৌযানে মহারাজ রুদ্রসাগরে নৌকাবিহার করতেন। বর্তমানে নীরমহলকে কেন্দ্র করে মেলাঘরে গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র।রুদ্রসাগরের পাড়ে প্রতি বছর পর্যটন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ত্রিপুরা সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দ্বারা এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে নীরমহল প্রাসাদকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে মেলাঘরের রাজঘাটে এই উৎসব অয়োজন করা হয়।প্রত্যহ শত শত পর্যটকের সমাবেশ ঘটে নীরমহলকে এক ঝলক দেখার জন্য। নীরমহলের চারপাশে অথৈ জলরাশি। চোখ যে দিকেই যায়, দেখা যায় নয়ন জুড়ানো দৃশ্য।রাজঘাট থেকে নৌকা করে নীরমহলে পৌঁছাতে ১০ মিনিট সময় লাগে।

মহারাজ বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর ছিলেন অতিশয় প্রজাবৎসল ও দূরদর্শী শাসক। প্রজাদের অকাতরে দান করতেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকুল আবহাওয়ায় প্রজাদেরক্ষয় ক্ষতি হলে মহারাজ খাজনা মুকুব করে দিতেন। ত্রিপুরা রাজ্য বহু জনজাতির মিলনস্থল। মহারাজ তাঁর প্রজাদের সন্তানতুল্য স্নেহ করতেন। অনুরূপ ভাবে প্রজারাও তাঁকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করতো।মহারাজ উচ্চমানের চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ ও লোকবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। বর্তমানে ত্রিপুরার অধিবাসীগণ তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সুফল উপভোগ করছেন।
সেই সময় রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট উন্নতমানের। রাজধানী আগরতলা থেকে মেলাঘর পর্যন্ত রাজপথ ছিল। মহারাজ অবকাশযাপনের জন্য নীরমহলে এলে সমগ্র এলাকাতে সাজ সাজ রব পড়ে যেত। রুদ্র সাগরের চারিদিকে তাঁবুর মধ্যে সৈন্য সামন্তরা অবস্থান করতো। রাজধানীতে গিয়ে প্রজাদের পক্ষে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করা, আর মহারাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয় ব্যাপার। তাই মহারাজের মেলাঘরে অবস্থানকালে রাজা ও প্রজার মিলনক্ষেত্রে পরিণত হত এই নীরমহল।
এখন মহারাজ নেই। কিন্তু রাজা ও প্রজার মিলনক্ষেত্র নীরমহল স্বপ্নপুরীর মতো সগৌরবে বিদ্যমান। এই স্বপ্নপুরীকে ঘিরে কত গল্প, কত কথা মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা রুদ্রসাগরের বুকে এসে পড়েছে। জলজ পাখিরা মেতে উঠেছে কলকাকলিতে। আকাশে এক ঝাঁক পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। পাড়ে বাঁধা নৌকাগুলি রুদ্রসাগরের জলতরঙ্গে দুলে উঠছে। হটাৎই একটি পানকৌড়ি মুখ তুলে আমাদের দেখে গেল। রুদ্রসাগরের জলরাশির উপর নীরমহলের উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হচ্ছে। এই মুহূর্তটি চোখে না দেখলে বা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে না পারলে, ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভবপর নয়। অনেক আশা আর অনেক স্বপ্ন নিয়ে আজকের সূর্য অস্তাচলের পথে, একটি নতুন দিনের সূচনার জন্য।

ডুবিয়া বিদায় লয় তব বুকে পল্লীর দিনগুলি,
তোমা সম্ভাষে হাসি উষা আসে পূর্ব দুয়ার খুলি।
আধো ঘুমোঘোরে প্রভাত তপন
তোমারি নয়নে নেহারে স্বপন।
বিদায় বেলায় ছলছল চায়, কাঁপে তায় ঢেউগুলি,
কুমুদির সাথে নাচে চাঁদ তব তরঙ্গে দুলি দুলি।
যাত্রাপথের বিবরণ : কলকাতা এবং দিল্লীর সঙ্গে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা রেলপথে সংযুক্ত। রেল ছাড়াও বিমানের মাধ্যমে আগরতলা সহজেই পৌঁছানো যায়। আগরতলা থেকে নীরমহলের দূরত্ব ৫৩ কিলোমিটার। আগরতলা পৌঁছাবার পর ভাড়া গাড়ি নিয়ে অতি সহজেই নীরমহল ঘুরে আসা যায়। থাকার স্থান : আগরতলা সহ নীরমহলের চারপাশে অসংখ্য হোটেল রয়েছে। পর্যটকরা নিজেদের সুবিধা মতো অনলাইনে হোটেল বুকিং করতে পারেন।