অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ, আমেরিকা থেকে || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:৫০ অপরাহ্ণ
গতকাল ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি, নিউইয়র্ক ও আশপাশের অঞ্চলজুড়ে আবহাওয়া ছিল বেশ প্রতিকূল। সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা; দমকা ও ঝড়ো হাওয়া, অবিরাম বৃষ্টি আর কনকনে ঠান্ডায় চারদিক যেন একেবারেই বিষণ্ন হয়ে উঠেছিল। এমন দিনে খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার সাহসই যেন কারও ছিল না। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া রাস্তাঘাটও ছিল অনেকটা নীরব।
যদিও গতবার স্ট্যাচু অব লিবার্টি গত ভ্রমণে দেখেছিলাম তথাপি এবারও নতুনভাবে দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে আমাদের “স্ট্যাচু অব লিবার্টি” দেখা শেষ পর্যন্ত স্থগিত করতে হলো। ছোট জাহাজে করে নদীপথে সেখানে যেতে হয়; কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তবে আমাদের দিনের ভ্রমণ সেখানেই থেমে থাকেনি।
হিলটন হোটেলে সকালের নাশতা শেষ করার পর সাগর আব্বু আমাকে এবং তার মাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে তখনও বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস আর কনকনে ঠান্ডা। কিন্তু সাগর আব্বুর উৎসাহে সেই প্রতিকূল আবহাওয়াও যেন আমাদের পথের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। প্রথমে সে আমাদের নিয়ে গেল প্রিন্সটন শহরে – বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলো দেখাতে। আইনস্টাইনের শেষ জীবনের আবাসস্থল, তাঁর গবেষণা ও কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থান এবং ঐতিহ্যবাহী প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে ঘুরে দেখাল। শুধু দেখালই না, প্রতিটি জায়গার ইতিহাস, আইনস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে বলল।
বৃষ্টিভেজা সেই প্রিন্সটন যেন অন্য রকম এক সৌন্দর্য ধারণ করেছিল। প্রকৃতির রুক্ষতা আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই ঐতিহাসিক পীঠস্থান – এই দুইয়ের এক অদ্ভুত সমন্বয় অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কয়েকটি ভবন দেখছি না; বরং বিশ্বজ্ঞান ও মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আইনস্টাইনের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হলো নিউ জার্সির আরেক বিস্ময় – স্বামী নারায়ন অক্ষরধাম। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই সাগর আব্বু আমাদেরকে সেখানে নিয়ে গেল। বাইরে তখনও ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টি, তার সঙ্গে ছিল বেশ তীব্র ঠান্ডা। কিন্তু অক্ষরধামের বিশাল প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কথা যেন কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গেলাম। চোখের সামনে যে দৃশ্যটি উদ্ভাসিত হলো, তা সত্যিই অভাবনীয়! মনে হলো, আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে হঠাৎ যেন ভারতের কোনো প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছি। বিশাল পাথরের মন্দির, অসংখ্য সূক্ষ্ম কারুকাজ, খিলান, স্তম্ভ, শিখর, মূর্তি, ফুল-লতাপাতার অলংকরণ – সবকিছুতেই ভারতীয় শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির অপূর্ব ছাপ।
প্রায় ১৮৩ একর বিস্তৃত এই বিশাল কমপ্লেক্সটি শুধু একটি মন্দির নয়; এটি যেন ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি সুবিশাল প্রদর্শনভূমি। মূল মন্দিরের স্থাপত্যের প্রতিটি স্তরে যে নিখুঁত শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা কাছ থেকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পাথরের গায়ে এত সূক্ষ্ম কারুকাজ কীভাবে করা সম্ভব হয়েছে – এ প্রশ্ন বারবার মনে জেগেছে।
প্রাঙ্গণের নীলকান্ত প্লাজাতে দাঁড়িয়ে থাকা ৪৯ ফুট উচ্চতার “নীলকান্ত স্বর্ণাভ মূর্তিটি” বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। বৃষ্টিভেজা পরিবেশে মূর্তিটির দীপ্তি যেন আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। চারপাশের সবুজ বাগান, রঙিন ফুল, জলাধার, পাথরের অলংকৃত স্থাপনা এবং পেছনে উঠে থাকা মন্দিরের শিখর – সব মিলিয়ে দৃশ্যটি ছিল অসাধারণ। সাগর আব্বু আমাদের নিয়ে পুরো বিশাল এলাকাটি ঘুরে ঘুরে দেখাল। কোথায় কী আছে, কোন স্থাপনার কী তাৎপর্য, কীভাবে এত বিশাল মন্দির নির্মিত হয়েছে – সব কিছুই বুঝিয়ে বললো।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে হাঁটতে আমাদের কষ্ট হচ্ছিল। আমার নিজেরও একটু দুর্বলতা ছিল। এত ঠান্ডা ও বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকায় ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয়ও হচ্ছিল। তবু “অক্ষরধাম” এর সৌন্দর্য ও বিশালত্ব আমাদেরকে বারবার সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এত দূর এসে এই অপূর্ব সৃষ্টি না দেখে ফিরে যাওয়া যায় না।
অক্ষরধামের সবচেয়ে বড় বিস্ময় শুধু এর আকারে নয় – ভারতকে এখানে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিই হয়তো এর অন্যতম বড় সৌন্দর্য। ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, শিল্প, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা দিককে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এই বিশাল প্রাঙ্গণে তুলে ধরা হয়েছে। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সভ্যতার এমন এক সুদৃশ্য উপস্থাপন সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।
বৃষ্টি তখনও থামেনি। ঠান্ডাও কমেনি। কিন্তু আমাদের দেখার আগ্রহও কমেনি। এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে গেল, টেরই পেলাম না। অবশেষে প্রায় দুপুর দুইটা পর্যন্ত অক্ষরধাম এর বিশাল প্রাঙ্গণ ঘুরে আমরা সেখান থেকে ফিরে এলাম। শরীরটা তখন কিছুটা ক্লান্ত। আমার নিজেরও মনে হচ্ছিল, এই ঠান্ডা-বৃষ্টিতে বুঝি এবার ঠান্ডা লেগেই যাবে। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত – শেষ পর্যন্ত আমার কিছুই হয়নি। মহান আল্লাহর কাছে এজন্য অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শুকরিয়া আদায় করলাম। গতকালের দিনটি তাই আমাদের কাছে শুধু একটি ভ্রমণের দিন ছিল না। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে আইনস্টাইনের স্মৃতিধন্য প্রিন্সটন এবং তারপর নিউ জার্সির মাটিতে ভারতীয় ঐতিহ্যের বিস্ময়কর প্রতিরূপ অক্ষরধাম – সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে থাকল স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় ভরা এক অনন্য দিন।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।