admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ
নাগরিক ভাবনাঃ অ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীনঃ আগামী কাল ৫ম ধাপের ইউপি নির্বাচন। দেশে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন চলমান । এই ধাপে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ২০ টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হবে। সারা দেশের নির্বাচনে এ পর্যন্ত এক হাজার ৫৭০ জন জনপ্রতিনিধি ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হওয়ায় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন । অথচ তৃণমূলের এ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থীর অংশগ্রহণের কথা।
কিন্তু একক প্রার্থী হিসাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুলসংখ্যক জনপ্রতিনিধি জয়ী হচ্ছেন, যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য অশনিসংকেত। এ থেকে উত্তরণে সরকার, রাজনীতিক ও নির্বাচন কমিশনকে ভাবতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করার সময় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের আরও অভিমত-দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ভোট হওয়া, অনেক রাজনৈতিক দলের অংশ না নেওয়া, আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে বিদ্রোহী না হওয়ার জন্য দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি, মাঠপর্যায়ে হুমকি-ধামকি ও প্রভাব বিস্তারের কারণে অন্যদের মাঠ ছাড়তে বাধ্য করায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ীদের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু নির্বাচনে এমন ফলাফল মোটেও ভালো নয়।
কয়েকটি কারণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ীদের সংখ্যা বাড়ছে। তার অন্যতম হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকা। তৃণমূল পর্যায়ে অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা সাধারণ মানুষকে সেবা দেন, তাদের পাশে থাকেন। মানুষও ওইসব ব্যক্তিদের বিশ্বাস করেন, ভালোবাসেন। কিন্তু ওইসব ব্যক্তি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তারা সমাজসেবী। দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় ওইসব মানুষ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। আরেকটি কারণ হচ্ছে, এ নির্বাচনে সরকারি দল থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার বা অন্য সাজামূলক ব্যবস্থা এড়াতেও অনেকেই প্রার্থী হচ্ছেন না। এছাড়া নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ব্যয় একটি ফ্যাক্টর। সবাই জানেন নির্বাচনে প্রার্থী হলে মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হবে।
দলীয় নেতাকর্মীরা প্রতীক পাওয়া প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবেন বা করতে বাধ্য হবেন। মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করেও তখন ভালো ফল পাওয়া যাবে না। আরেকটি কারণ হচ্ছে, অনেক রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এতে প্রার্থীও কমেছে। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনমুখী। তারা নির্বাচনকে একটি উৎসব মনে করেন। এ দেশেই প্রার্থীর অভাবে অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে যাচ্ছেন। এটা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার জন্য ভালো লক্ষণ নয়। এ বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুলসংখ্যক জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীতে খারাপ নির্বাচনের ইতিহাস রচনা হচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, রাউজান ও লাকসাম উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত সদস্য ও সাধারণ সদস্য-সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এমন ঘটনা পৃথিবীর কোথাও আছে?
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সেই যে ধারা তৈরি হয়েছে তা তৃণমূলে ছড়াচ্ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক দল, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কারও মাথাব্যথা নেই। নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় এসব প্রার্থী জয়ী হয়েছেন-সেই যুক্তি দিচ্ছেন সবাই। কিন্তু কেন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হচ্ছে না তা নিয়ে কেউ কথা বলছেন না। মূলত নির্বাচন প্রক্রিয়ার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটাকে কোনো নির্বাচন বলা যাবে না। এ নির্বাচন তৃণমূল পর্যায়ে উৎসব নয়, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
নির্বাচনের নামে যা হচ্ছে তা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার জন্য অশনিসংকেত। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে কারসাজি এবং টাকা ও ক্ষমতার প্রভাবের কারণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ীর সংখ্যা বেশি হয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে অনেক প্রার্থী বিনিয়োগ করেছেন। তারা দলীয় মনোনয়ন পাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের টাকা ও ক্ষমতার প্রভাবে মাঠছাড়া করাসহ এমন কোনো পদক্ষেপ নেই, যা করেননি। স্থানীয় সরকারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মচ্ছব বন্ধ হওয়া জরুরী।
পাঁচ-ছয় বছর আগেও স্থানীয় সরকারের ইউপি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কারও নির্বাচিত হওয়া ছিল প্রায় অকল্পনীয়। এখন তা সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী সংকট শুরু হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমত, দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সরকারি দলের প্রার্থীর বাইরে কারোর নির্বাচন করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, এ পদ্ধতির ফলে এলাকার নির্দলীয়, সৎ, সুশিক্ষিত সমাজসেবীরা নির্বাচন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। কারণ দলীয় ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশিশক্তির দিক থেকে যারা সবল তারাই কেবল নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা ভাবছেন। পরিণতিতে দেখা দিচ্ছে প্রার্থী সংকট। পাঁচ ধাপে ৩ হাজার ৭৪৪ ইউনিয়ন পরিষদে ইতিমধ্যে ১ হাজার ৫৭০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে কারসাজি ও প্রভাব খাটিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন প্রার্থীরা। তারা জনপ্রতিনিধি হতে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ শুধু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করছেন। আবার অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বীকে টাকা দিয়েও নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশের রাজনীতি কতটা অধঃপতিত অবস্থার শিকার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর মহাবিজয় তারই প্রমাণ। সুষ্ঠ পরিবেশ থাকলে এদের অনেকে নিজেদের জামানত বজায় রাখতে পারতেন কি না তা একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়।
ঠাকুরগাঁওয়ে অধিকার সুরক্ষা পরিষদ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। ২৬ ডিসেম্বর জেলার সদর উপজেলার ২০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণ হবে। নির্বাচন সুষ্ঠ পরিবেশে করার দাবীতে পরিষদের কর্মকর্তাবৃন্দ একাধিকবার জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাৎ করেছে। মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনী প্রচারে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছে। ইতোপুর্বে পীরগঞ্জ ইউপিতে প্রানহানির ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ কল্পে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সংগঠনটি সুষ্ঠ নির্বাচনের দাবীতে ২২ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও চৌরাস্তায় মানববন্ধন করেছে।