admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২০ ১১:৫১ অপরাহ্ণ
ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও করোনা ভাইরাস আর লকডাউনয়ের কারনে আম চাষীদের মাথায় হাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত অনুযায়ী, দেশটিতে মোট গড় আম উৎপাদন হয় ১২ লাখ টন। আমের অঞ্চল হিসেবে প্রসিদ্ধ রাজশাহীর আম উৎপাদনকারীরা এ বছরের প্রথম থেকেই বৈরি আবহাওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করছিলেন। এরপর করোনা পরিস্থতিতে যানবাহনের অভাবে পাইকারি ক্রেতা না থাকায় আমের বাজারজাতকরণ নিয়েও যথেষ্ট চিন্তিত ছিলেন তারা। মে মাসের শেষে আম পাড়ার মৌসুম শুরু হবার আগে আমের বাজারজাতকরণে সরকারের গৃহীত নানান পদক্ষেপে তারা যখন আবার আশাবাদী হয়ে উঠছিলেন, সেই মুহূর্তে বৃহস্পতিবার তাদের আম বাগানগুলো ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কবলে পড়ল।

করোনার লকডাউনের মধ্যে ঝড়ে ঝরে পড়া আম বিক্রি করার কোন জায়গা না থাকায়, আম উৎপাদনকারীরা বলছেন চলতি মৌসুমে আম নিয়ে তাদের শেষ আশাটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় আম্পান দেশের উপকুলীয় অঞ্চলের সাতক্ষীরাতে ঘন্টায় ১৫১ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানার পর দুর্বল হয়ে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়েছে এবং রাজশাহী অঞ্চলে ঘন্টায় ৫৯ কিলোমিটার বেগে আঘাত হেনেছে।
সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলেছেন সারাদেশের মোট আম বাগানের ১০ শতাংশ ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং সাতক্ষীরাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের আম উৎপাদনকারীরা বলছেন, ঝড়ে তাদের বাগানগুলোতে অর্ধেকেরও বেশি আম ঝরে গেছে। এমনকি অনেক আম গাছ উপড়ে গেছে। ঝরে পড়া আমের খানিকটা অংশ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এক টাকা কেজি দরে কিনে নিয়ে গেলেও, বেশিরভাগ আম কুড়িয়ে নিতেও কেউ আসে নি, বাগানেই পড়ে থেকেই আম নষ্ট হচ্ছে। আম উৎপাদনকারীরা দাবি করেছেন, সরকার যদি তড়িৎ গতিতে ফল প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঝরে পড়া আমগুলো কিনে নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে তাদের দুর্দশা কিছুটা হলেও কমবে।
সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলেছেন সারাদেশের মোট আম বাগানের ১০ শতাংশ ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঝড়ে পড়া আম বিক্রি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সরফ উদ্দিন আম উৎপাদনকারীদের দাবির উত্তরে বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন একটি স্থান নির্বাচন করে আম উৎপাদনকারীদের আহ্বান জানাতে পারে সেখানে ঝরে পড়া আম নিয়ে যেতে এবং ফল প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পগুলোকে সেখানে ডাকতে পারে সেই আমগুলো কিনে নেবার জন্য।

প্রায়ই ঝড়ে আম পড়ে। ঝরে পড়া আম কেনার জন্য কাউকে পাওয়া যায় না। কিন্তু এই আমগুলোর যথেষ্ট খাদ্যমান আছে। এ আমগুলোর ভাল ব্যবহার কীভাবে হতে পারে সে বিষয়ে সরকারের একটি নির্দিষ্ট নীতি থাকা উচিৎ,” বলছেন ড. ড. সরফ উদ্দিন। ড. সরফ উদ্দিন গত এক দশকের বেশি সময় ধরে আম গবেষণায় নিয়োজিত এবং রাজশাহীতে তার নিজস্ব আম বাগান গড়ে তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার বাগানের সম্ভাব্য মোট ১২ টন আমের মধ্যে প্রায় দুই টন আম ঝড়ে পড়ে গেছে।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আম উৎপাদনকারী আনোয়ার হোসেন পলাশ বলছিলেন, “ঝড়ের তান্ডব দেখার পর আমার মাথা কাজ করছে না। কোন কিছুই সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারছি না। তিনি জানিয়েছেন, তার ১৩ একরের আম বাগানে অন্তত ৬০০ মণ আম হতো। ঝড়ে ৪০০ মণের মত আম পড়ে গেছে। ঝরে পড়া আমের বেশিরভাগই ছিল ফজলি ও আশ্বিনা জাতের।
আমাদের এখানে প্রথা আছে যে আম গাছে থাকা অবস্থায় বাগান মালিক ছাড়া অন্য কেউ আম পেড়ে খাবে না। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে ঝরে পড়া আম বাগান মালিক কখনো তাকিয়েও দেখবে না। আম্পানে ঝরা আমের অল্প কিছু স্থানীয়দের কেউ কেউ কুড়িয়ে নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বেচে দিয়েছে।
তারপরও বাগানে অনেক আম পড়ে আছে। সেগুলো কুড়ানোরও কেউ নেই, কেনারও নেই। করোনার মধ্যে কেউ তো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না, পরিবহনও সেরকম মিলছে না। সব মিলিয়ে মাথায় হাত পড়েছে আমাদের, বল ছিলেন আনোয়ার হোসেন পলাশ। তিনি জানিয়েছেন, বাগান থেকে ব্যবসায়ীরা ঝরে পড়া যেসব আম সংগ্রহ করেছেন এক টাকা কেজি দরে, স্থানীয় বাজারে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে পাঁচ টাকা থেকে ২০ টাকা কেজি দরে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে আমগুলো পাকার পর বাজারে নিতে পারলে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো।
আমের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সমস্যা চাঁপাইনবাগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় আম উৎপাদনকারীদের নেতা ইসমাইল খান জানিয়েছেন, এ বছর করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আমের ব্যবসা কেমন করে হবে সে বিষয়ে কোন পরিষ্কার ধারণা কারোর না থাকাতে, অনেকে আম গাছের পরিচর্যা করা থেকে বিরত ছিলেন। গাছগুলোতে আম প্রাকৃতিকভাবেই বড় হচ্ছিল।
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে যখন গাছে মুকুল আসছিল তখন কয়েকবার বৃষ্টি হওয়াতে অনেক মুকুল ঝরে পড়েছিল। আবার মার্চের মাঝামাঝিতে যখন ফল ধরতে শুরু করল, তখন দরকার ছিল প্রচণ্ড গরমের, কিন্তু তখনও রাতে ঠাণ্ডা পড়ত, কুয়াশা ঝরত। এতে করে এবার ফলন কমে গেছে,” বলেন ইসমাইল খান। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. মোশাররফ হোসেন বলেছেন এবার অন্তত ২০ ভাগ ফলন কমে গেছে বৈরি আবহাওয়ার কারণে। এবছর গ্রীষ্ম এসেছে দেরিতে। প্রলম্বিত শীতের শেষভাগে আবার কয়েকবার বৃষ্টি হয়েছে। এতে করেই ফলন কমেছে, তিনি বলেন এবং যোগ করেন যে, আমের মৌসুমও দুই সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে দেরিতে গ্রীষ্ম আসার কারণে।স্থানীয় প্রশাসনগুলো নির্ধারণ করেছিল, ১৫ মে থেকে আম পাড়া শুরু হবে। কিন্তু ঐ সময়ে অধিকাংশ আম উৎপাদনকারী আম পাড়া শুরু করতে পারেননি। তারা বলেছেন, মে মাসের শেষের কয়েক দিনের আগে আম পাড়া শুরু করা যাবে না।