আজাহার রাজা,ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬ ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ এলাকায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দখল করে দোকান নির্মাণ এবং ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এটি শুধু জমি দখলের ঘটনা নয়; জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননা।
অভিযোগ অনুযায়ী, নেকমরদ কুসুমউদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সংলগ্ন স্থানে ভবানন্দপুর মৌজায় ২১০-২১১ নং দাগে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা নায়েক মোহাম্মদ রুস্তম আলী এবং শহীদ মফিজ উদ্দিনের কবর সংরক্ষিত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা কবর দুটি ঘিরে সেখানে দোকান নির্মাণ করা হয় এবং ভাড়া দেওয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নথি অনুযায়ী, নায়েক মোহাম্মদ রুস্তম আলী ছিলেন সেক্টর-৬ এর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদ হন। তার নাম সরকারি শহীদ গেজেটেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী গেজেট নং ৪৯৬। শহীদ মফিজ উদ্দিনের তথ্য পাওয়া
যায়নি ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কবরের ওপর দোকান, নিচে শহীদের সমাধি, মোটরসাইকেল মেরামতের দোকান পরিচালিত হচ্ছে ওই স্থানে। দোকানের ভেতরে লোহার পাটাতন ও টিনের আচ্ছাদনের নিচে কবরটি ঢেকে রাখা হয়েছে। তার ওপর রাখা হয়েছে যন্ত্রপাতি, টায়ার, ময়লা-আবর্জনা ও অন্যান্য সরঞ্জাম।
স্থানীয় বাসিন্দা মোকসেদুর রহমান বলেন,এখানে শহীদ রুস্তম আলী ও শহীদ মফিজ উদ্দিন দুইজন মুক্তিযোদ্ধার কবর ছিল। সেই কবর দখল করে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা।
দোকানের ভাড়াটিয়া জ্যোতিষ চন্দ্র রায় স্বীকারোক্তি দিয়ে জানান, তিনি প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর আগে দোকানটি ভাড়া নেন। “দোকানের ভেতরে একটি কবর রয়েছে, সেটা জেনেই আমি দোকান ভাড়া নিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরেই এভাবে ব্যবসা চলছে। আমরা কবরের অংশটি লোহার পাটাতন দিয়ে ঢেকে রেখেছি। প্রতি মাসে দোকান ভাড়া পরিশোধ করি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোহাম্মদ রিয়াল ও তার পরিবারের সদস্যরা কবরস্থানের জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দোকান নির্মাণ এবং ভাড়া আদায় করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে তারা জায়গাটি ভোগদখলে রেখেছেন।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ রিয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,কবরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। তাই আমি ঘেরা দিয়ে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছি। পরে সেখানে দোকান হয়েছে। যদি প্রশাসন নির্দেশ দেয়, তাহলে আমি স্থাপনাটি সরিয়ে কবরটি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেব।
নেকমরদ কুসুমউদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, তিনি বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই কবরটি উন্মুক্ত অবস্থায় দেখে আসছিলেন। গত কয়েক বছরে কবরটির চারপাশে ঘেরা দেওয়া হয় এবং পরে সেখানে দোকান নির্মাণ করা হয়। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে বহু মানুষের নজরে এসেছে।”
শহীদ রুস্তম আলীর ছেলে সেকান্দার আলী অভিযোগ করে বলেন,আমার বাবার কবর অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবরের ওপর ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক এবং কবরটি উদ্ধার করুক।
বিষয়টি নিয়ে রাণীশংকৈল উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে এবং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে,স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি জাতির গৌরব। সেই স্মৃতিচিহ্ন দখল ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তারা দ্রুত তদন্ত করে কবরস্থানটি উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের স্বার্থে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।