আবু মহী উদ্দীন || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর, ২০২৫ ৯:৪০ অপরাহ্ণ
কদিন আগে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন হয়ে গেল। তার কদিন পরেই বাংলাদেশে শিক্ষকরা তাদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া নিয়ে রাজপথে নামে। মোটামুটি ভাবে এ দৃশ্য সারা বছরেরই। এর অবশ্য কারণ আছে , দেশে অনেক জাতের শিক্ষক আছে। এবতেদায়ী , স্বতন্ত্র এবতেদায়ী, কওমী, সরকারী প্রাথমিক, জাতীয়করণকৃত সরকারী প্রাথমিক, বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ননএমপিও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, পলিটেকনিক শিক্ষক, নার্সিং শিক্ষক, ভোকেশনাল শিক্ষক, টেক্সটাইল শিক্ষক, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যায় শিক্ষক, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিএড কলেজের শিক্ষক, বিপিএড কলেজের শিক্ষক আরো অনেক জাতের।
মাঝে মধ্যেই শিক্ষকদের আন্দোলন হয়। এটা সব সরকারের আমলেই হয়। আর সেই সময় বিরোধী দলের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা শহীদ মিনারে , প্রেসক্লাবে বা শাহবাগে ঢাকঢোল পিটিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করে। সরবত খাইয়ে অনশন ভঙ্গ করায় এবং প্রতিশ্রুতি দেয় , যদি তারা সরকার গঠন করে তাহলে সবার আগে শিক্ষকদের সমস্যার সমাধান করবে। আর তখনই সেই রাজনৈতিক দলের ১টা ফন্ট তৈরি হয়। তার পর সেই দল ক্ষমতায় গেলে আন্দোলন করলে আবার শিক্ষকদের লাঠিপেটা করে। শিক্ষকরা আবার কেবলা বদল করে। আর সরকার ২/১ পার্সেন্ট দাবী দাওয়া মেনে নেয়, আন্দোলন থামে। আবার আর এক গ্রুপ আন্দোলনে আসে। ্অবশ্য এর কারণ আছে। তা হলো আসলে শিক্ষকদের চাকুরীতে কোন নীতিমালাই নেই। একবারের আন্দোলনে কোন গ্রুপের কিছু দাবী দাওয়া পুরণের কারণে অন্যদের সাথে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। সে কারণে ঐ গ্রুপ আবার সমতার জন্য আন্দোলনে নামে। এটা যেন জহির রায়হানের লেখা উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের মতো। সেই যে ইয়াদ আলী মাষ্টারের প্রশ্ন আর আমাদের শিক্ষকদের জীবনযাত্রা এর মধ্যে তেমন কোন মৌলিক পার্থক্য কি আছে? সরকার বানী দেয় জাতী গঠনের , যারা জাতী গঠন করে তাদের পেটে ভাত নাই। তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করতে হয়না, বাজার করতে হয়না , তাদের ঈদ পরব নাই। আত্মীয়তা নাই।
আগে শিক্ষক নিয়োগ হতো রাজনৈতিক বিবেচনায় লাখ লাখ টাকা দিয়ে। এই কাজটা করতে গিয়ে ম্যানেজিং কমিটি ‘শিক্ষক’ নিয়োগ করতে পারেনি , তারা ‘মানুষ’ নিয়োগ করেছে। তার বাড়ী স্কুলের কাছে , তিনি টাকা দিতে পেরেছেন বেশী, ফলে তিনি শিক্ষক হতে পারবেন কিনা সেটা বিবেচনা করার সুযোগ পাননি ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা। তিনি ম্যানেজিং কমিটির প্রভাবশালীর নিকটজন ফলে তার স্কুলেও আসতে হয়না। তিনি রাজনীতি করেন। দলীয় কর্মকান্ডে সময় দেওয়ার কারণে স্কুলে সময় দেয়া আর তার হয়ে উঠেনা।
এখন শিক্ষক নিয়োগ আর ম্যানেজিং কমিটির হাতে নাই। এনটিআরসি নামের একটি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক নিয়োগ করে। এরা আগে কেবলমাত্র শিক্ষকতার লাইসেন্স দিতো। সে সময় তারা কম কেলেঙ্কারী করেনি। এখন লাইসেন্সও দেয় আবার নিয়োগও করে। এখন কিছুটা নিরপেক্ষতা বোঝা যায়। তবে বাংলাদেশের মানুষ তো ছাই দিয়ে দড়ি পাকাতে পারে। তবে সেটা ব্যতিক্রম। অভিযোগ থাকলেও তা প্রকট নয়।
শিক্ষার কর্মকর্তাদের ছেলেমেয়েরা এসব স্কুলে কোনদিন পড়েনা ভবিষ্যতেও পড়বেনা। তারা আবার জাতীয় মেরুদন্ড মজবুত করার জন্য গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছেন। তারা আবার বানী দেন। মানসম্মত শিক্ষার জন্য তারা প্রানাতিপাত করেন। তারা উপদেশ পরামর্শ নির্দেশনা খয়রাত করেন। তারা শুধু নছিহত করেন। একটা আইন করুননা শিক্ষা বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ছেলেমেয়েদের বাধ্যতামুলকভাবে দেশের স্কুলে লেখাপড়া করতে হবে। নিজেরা যে কাজ করেননা তা অন্যদের করতে বলেন কিভাবে? এনটিআরসি যদিও একটা নীতিমালা করেছে স্কুলের কাছের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য । কিন্তু সব সময় তা হয়ে উঠেনা। ফলে অনেকের দুরে পেষ্টিং হয়। দুরে নিয়োগের ক্ষেত্রে মহিলাদের সমস্যাটা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। আন্দোলনরত শিক্ষকদের মধ্যে নুতন নিয়োগপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক সাক্ষাতকারে বললেন তিনি ৩০০ কিলোমিটার দুরে চাকুরী করেন। যদিও বুঝতে পারিনি এতো দুরে কেনো হবে? হতেও পারে।
তার বেতন ১২৫০০/ টাকা। তিনি মাঝে মাঝে বাড়ীতে আসবেন। তার মা বাবা অসুস্থ্য হলে ঔষধ পত্র কিনবেন বা ডাক্তার দেখাবেন। ছোট ভাইবোন থাকতে পারে। তাদের বই খাতা কিনে দেওয়া লাগতে পারে। তাদের আবদার থাকতে পারে। নিজের শাড়ী কাপড় কিনতে হবে। তিনি যেখানে চাকুরী করতে গেছেন সেখানে তো তার জন্য কোয়ার্টার রেডি নাই। ঘর ভাড়া নিতে হবে। একজন মহিলার ঘর ভাড়া নেওয়ার সময় অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয়। এর পর হাট বাজার করতে হবে। পুরুষরা হেঁটে যেতে পারলেও মহিলাদের পক্ষে তা সম্ভব হবেনা। পরিবহনের জন্য কিছু খরচ করতে হবে। অবশ্য সরকার বা কর্তৃপক্ষ বলতে পারে একজন মানুষের গোটা পরিবারের দ্বায়িত্ব নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব না, কথাটা ঠিক। তবে তাকে একটা সম্মানজনক সেলারীতো দিবেন। একজন সরকারি চাকুরের পিওনের চেয়ে বেতন যদি কম হয় তাহলে তার মেরুদন্ড সোজা থাকবে? তার মেরুদন্ড সোজা না থাকলে জাতির মেরুদন্ড কিভাবে সোজা করবেন।
শিক্ষাক্ষেত্রের এই সব সমস্যা সমাধানে কাজ যে হয়নি তা হয়। অন্তত হাজার খানেক কমিটি, কমিশন ইত্যাদি হয়েছে। তারা বৈঠক , সেমীনার ওয়ার্কশপপ করেছেন, মিটিংয়ে চা পানি খেয়েছেন। সব শেষে অশ^ডিম্ব প্রসব করেছে। বর্তমানে শিক্ষকদের ৩ দফা দাবী আদায়ে আন্দোলন চলছে। বক্তৃতা বিবৃতিতে তারা আকাশ ভেঙ্গে মাটিতে ফেলছেন। সারা দেশে লক্ষ লক্ষ শিক্ষক আছেন। ৭ দিনের জন্য ঢাকায় এসে রাস্তায় শুয়ে থাকার মতো অবস্থা সবার নেই। সুতরাং নেতা গোছের যারা তারা যা নির্দেশনা দেয় তারা তার পিছনে রাজনৈতিক দল, কাতারবন্দী হয়ে যায়। তাদের আবার জামাত বিএনটি আওয়ামী লীগের বাহারী নামে রাজনৈতিক দলের শিক্ষক ফন্ট আছে। শিক্ষকরাও সংগঠন বেছে নিয়েছে বাধ্য হয়ে। তারা সারা বছর ধরে স্মারক লিপি দেয়, মানববন্ধন করে কিন্তু দাবী আদায় হয়না।
এভাবে আন্দোলন ধুমায়িত হয় এবং অক্টোবর মাসে এসে তা তুঙ্গে ওঠে। এ সময় আলটিমেটাম ঘেরাও সমাবেশ ইত্যাদি হয়। বিষয়টি অনশন পর্যন্ত গড়ায়। শিক্ষা বিভাগের আন্দোলনের মোক্ষম সময়ই অক্টোবর। এ সময় ছাত্র অভিভাবক সবাই উৎকন্ঠিত হয়। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। সেই সময়ে ক্লাশ বর্জন। শিক্ষা বিভাগে বছরের অর্ধেক দিনই বিভিন্ন ভাবে ছুটি। ১০৪ দিনতো সাপ্তাহিক ছুটি। ঈদ পুজা গ্রীষ্মকালীন শীতকালীন ধান্য রোপন সহ অন্যান্য ছুটি। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন করতে করতে নভেম্বরের অর্ধেক চলে যায়। এর পর পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের অভাব আর পুরণ হয়না।
আমাদের দেশের শিক্ষাতো সব সময়ই পরীক্ষা মুলক।
এতো জরুরী একটা বিষয়, অথচ এতোগুলি কমিশন হলো যদিও এতো গুনীজনদের নিয়ে গঠিত বিদেশী বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত কমিটি অশ্বডিম্ব প্রসব করেছে। জুলাই আন্দোলনের বেনিফিসিয়ারি এই সব মহামানবরা মুল দাবীদারদের বাদ দিয়েই সনদ স্বাক্ষর করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কেবলমাত্র ক্ষমতার আকাংখা ছাড়া আর কিছুর প্রতিফলন ঘটেনি। শিক্ষা বিষয়ে কোন কমিশন গঠন করার কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভুত হয়নি। তবে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময়ে গঠিত কমিটি সাব কমিটি বিষেশজ্ঞ যত বিদেশ ভ্রমন করেছেন, বিদেশে সেমীনার ওয়ার্কশপ করেছেন জ্ঞান অর্জন করতে প্লেজার ট্রিপে গেছেন সেই টাকা হলে শিক্ষকদের চাকুরী জাতীয়করণই করা যেতো।
সৃজনশীল পদ্ধতির আবিষ্কার হলে মাঝে মাঝে শিক্ষকদের ট্রেনিং দেখতে জেলা শিক্ষা অফিসার সাহেব নিয়ে যেতেন। ৫দিনের বিধিবদ্ধ ট্রেনিং। সকাল ৯-টা থেকে ৫-টা। সবাইকে ১ টা করে ব্যাগ, খাবার, যাতায়ত ভাতা সম্মানী ইত্যাদি।
দেখাশোনা করার জন্য স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাগণ তো আছেনই, আবার অস্থানীয় কর্মকর্তাও আছেন। তবে অভিজ্ঞতা হলো সকাল ১১টার আগে ট্রেনিং শুরু করা যেতোনা আর দুপুরের খাবারের পর তাদেরকে রাখা যেতোনা। এসব ট্রেনিংয়ে বক্তৃতা ভাড়া দেওয়ার জন্য শিক্ষা বিভাগীয় কর্মকর্তাগণ আসেন। সে এক কর্মযজ্ঞ। কিন্তু ফলাফল গাইড বইয়ে সমাপ্তি।
রাজধানীর স্কুলগুলোতে উপচেপড়া শিক্ষক, মফ:স্বলের স্কুল গুলোতে আজীবন শিক্ষক ঘাটতি। মনে হয় দেশে শিক্ষিত লোকই নাই। ভালো শিক্ষক নিয়োগ না করলে ভালো ছাত্র পাওয়া যাবে কি করে? শিক্ষকদের আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোরও মৌসুম শুরু হয়। কারন শিক্ষকরা নির্বাচনে দারুন ভুমিকা পালন করতে পারেন। তারা সব সময়ই রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রীড়নকে পরিনত হয়। তারা নিয়মিত শহীদ মিনারে বা শাহবাগে অথবা আর প্রেস ক্লাবে দিয়ে কিছু বিনোদন দিয়ে আসেন। একাত্মতা ঘোষণা করেন কখনো সরবত খাইয়ে অনশন ভঙ্গ করান। সরল শিক্ষকরা আশায় বুক বেঁধে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন। তারা কামান চেয়েছিলেন তবুও যাহোক বন্দুক পেয়েছেন।
| Sun | Mon | Tue | Wed | Thu | Fri | Sat |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | |
| 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 |
| 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 |
| 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 |
| 28 | 29 | 30 | 31 | |||