admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি, ২০২৩ ৮:১৮ অপরাহ্ণ
সনত চক্রবর্ত্তীঃ ফরিদপুরে ফসলের ক্ষেতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিচ্ছেন কৃষকেরা। এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন কৃষিজ ও প্রাণিজ খাদ্যের মাধ্যমে কীটনাশক মানবদেহে প্রবেশের কারণে মানুষের হার্ট, কিডনি, লিভার, স্নায়ু, ত্বক আক্রান্ত হচ্ছে। নানাবিধ ফলমূলে রাসায়নিক পাউডার দিয়ে কাঁচা ফল পাকানো হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, কীটনাশক বিক্রি ও ব্যবহারে নেই কোনো তদারকি। ক্ষতিকর বালাইনাশকের লাগাম টানতে না পারলে ঝুঁকি কমবে না জনস্বাস্থ্যের। কীটনাশক ব্যবহারকারী কৃষকদেরও নেই কীটনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ। গ্রাম গঞ্জের মুদি দোকানেও কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। এসব কীটনাশক বিক্রেতারাই বিষ বিশেষজ্ঞর মতো কোন ফসলে কী পরিমান কীটনাশক প্রয়োগ, কীটনাশকের গুণাগুণ গড় গড় করে কৃষকদের বলে যান। কৃষকরাও না বুঝে তাদের কথায় মুগ্ধ হয়ে কীটনাশক ব্যবহার করছেন। বছরে অন্তত কয়েক কোটি টাকার নিষিদ্ধ ভারতীয় কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। মারাত্মক ক্ষতিকর যে কীটনাশক দেড় দশকেরও বেশি আগে নিষিদ্ধ করা হয়।
কৃষি অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কীটনাশক ব্যবহারের পর মাত্রা অনুযায়ী ৭-১০ দিন পর ফল ও সবজি সংগ্রহ করে বাজারজাত করার নিয়ম, কিন্তু আমাদের কৃষকরা বিষ ব্যবহারের ১-২ দিন পরই ফল-সবজি সংগ্রহ করে বিক্রি করেন, যা আমরা প্রতিনিয়ত খাচ্ছি। ফলে কৃষিপণ্যের বিষক্রিয়ায় মানুষ ক্যানসারের মতো বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে জেলার স্বাস্থ কমপ্লেক্সে প্রধান বলেন, ফসলে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে কিডনি ও যকৃতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হচ্ছে। কৃষি বিভাগের নিয়মানুযায়ী সহনীয় পর্যায়ে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা উচিত, তাহলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে না।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় ৩৩২৯১৮ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। এসব জমিতে ধান, পাট, সবজি, শর্ষে, মসুর, আলু, ফলসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ হয়। ফসলের খেতে প্রাথমিকভাবে জৈব সার, ফেরোমোন বড়ি এবং হাত ও আলোর ফাঁদ দিয়ে পোকা দমনসহ যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। তাতে কাজ না হলে পরিমিত পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। জেলায় কৃষকদের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) ও সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা (আইসিএম) ক্লাব আছে। এসব ক্লাবে কৃষকদের সার ও কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপরও অনেক কৃষক অধিক ফলনের জন্য খেতে বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেন। ফসলের খেতে সার ও কীটনাশকের অতি ব্যবহারের কারণে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করতে গিয়ে ফসলের উপকারী পোকামাকড়ও ধ্বংস হচ্ছে। কীটনাশকের কারণে বিল, হাওর মাছশূন্য হয়ে পড়েছে।
বোয়ালমারী নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের উর্দ্যোতা আমির চারু বাবলু বলেন, আমাদের সবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, পরিবেশকে দূষিত না করে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পুষ্টিমান সমৃদ্ধ হাইব্রিড শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে আর এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূল হবে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিমান সমৃদ্ধ।
জেলার বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালি, সালথা,নগরকান্দা, ভাঙ্গাসহ স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাছে অধিক ফলনের জন্য ক্ষেতে বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী কোনো ফসলে এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন পরপর ক্ষেতে কীটনাশক দেওয়ার কথা। কীটনাশক প্রয়োগের এক সপ্তাহ পর ফসল সংগ্রহ করার কথা থাকলেও অনেক কৃষক তা প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফসল সংগ্রহ করে বাজারজাত করছেন। এসব কীটনাশক প্রয়োগ করলে খেতের আশপাশের নদী, ছড়া, নালা এমনকি জলাভূমিতে তা ছড়িয়ে পড়ে উদ্ভিদ, ব্যাঙ, মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী মারা যায়।
বোয়ালমারী উপজেলার গ্রামের কৃষক রহমান বলেন, এবার দুই বিঘা জমিতে বোরো ধান করেছি। কৃষি বিভাগের পরামর্শমতো খেতে সার ও কীটনাশক দিয়েছি। ধানের গাছ ভালো হয়েছে। আশা করছি, ফলন ভালো হবে। ফরিদপুর সদর উপজেলার গঙ্গাবর্দি গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, এবার দুই বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। খেতে অল্প অল্প করে সার ও কীটনাশক দিতে পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ। এতে ধান ভালো হয় না, পোকামাকড়ে খেয়ে যায়। আমি একটু বেশি পরিমাণ সার ও কীটনাশক খেতে দিয়েছি। ধানগাছের যে অবস্থা, তাতে ধান ভালোই হবে।
জেলার কৃষি কর্মকর্তা বলেন, পরিমিত পরিমাণ সার ও কীটনাশক সার ব্যবহার করলে ফসলের উৎপাদন বাড়ে। কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত কৃষকদের সহনীয় পর্যায়ে সার ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সার, ফেরোমোন বড়ি এবং হাত ও আলোর ফাঁদ দিয়ে পোকা দমনসহ যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে কাজ না হলে পরিমিত পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।