মুক্ত কলম || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৫ ১:৫৪ অপরাহ্ণ
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, সুস্থ থাকার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষকে বছরে গড়ে ১১০টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি বলছে, দেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে মাত্র ৫০ থেকে ৫৫টি। দরিদ্রদের মধ্যে এ হার ১০ থেকে ১৫টির মধ্যে আটকে থাকে।
অথচ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বছরে জনপ্রতি গড়ে ২৭০টি ডিম পেটে চালান করেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে দৈনিক ডিমের চাহিদা দুই কোটি ৭০ লাখ। বর্তমানে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হচ্ছে তিন কোটি পিস। ডিম উৎপাদনে দেশে কোনো ঘাটতি নেই।
তবে ২০২১ সালে প্রতিদিন ডিমের দরকার হবে ৪৫ কোটি পিস। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ সালে মুরগির ডিমে কৃত্রিমভাবে তা দেওয়ার পদ্ধতি আবিস্কার করে মিসরীয়রা। অনেকেই বলেন, মুরগির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ডিমের রঙ হয়। সাদা মুরগির ডিম সাদা হয়। বাদামি ও লাল মুরগির ডিম বাদামি রঙের। তবে সব মুরগির ক্ষেত্রে এ নিয়ম ধরাবাঁধা নয়, ব্যতিক্রমও আছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিমের রেকর্ড এখন জার্মানির দখলে। ২০১৬ সালে জার্মানির ভস্টেনবুটেল শহরের একটি মুরগি ২০৯ গ্রামের বড় ডিম পেড়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। এর আগে এ রেকর্ড ছিল ব্রিটিশদের দখলে। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের এসেক্সের একটি মুরগি ৯ দশমিক ১ ইঞ্চি পরিধির একটি ডিম পাড়ে।
বিশ্বে ৪০ শতাংশ ডিমের জোগান দেয় চীন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। চীন সব নকল করতে পারে। এ ধারণা থেকে অনেকে অভিযোগ করছেন, চীন নকল ডিম বাজারে ছেড়েছে। তবে চীন থেকে ডিম আমদানি করে না বাংলাদেশ। তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ অন্যান্য মাধ্যমে নকল ডিমের ছবি দেখিয়ে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজারে ঢুকছে রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি কৃত্রিম নকল ডিম। এমন অপপ্রচারে বাঙালির পাত থেকে প্রোটিনের অন্যতম উপাদান ডিম উধাও হওয়ার জোগাড়। এরই মধ্যে অনেকে শিশুদের ডিম খাওয়ানো বন্ধও করে দিয়েছেন।
নকল ও কৃত্রিম ডিম বাজারে সয়লাব হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এ নিয়ে গবেষণা শুরু করে। তাদের গবেষণায় ডিম নকল হওয়ার তথ্য মেলেনি। নারায়ণগঞ্জ সদরের ইমাম পোলট্রির ম্যানেজার রায়হান আলম বলেন, খামারে হাঁস-মুরগি সব সময় একই রকমের মসৃণ ডিম দেয় না। অনেক সময় ডিম আঁকাবাঁকা ও বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। এগুলোকে নকল বা প্লাস্টিকের ডিম মনে করে অনেকে ভীতি ছড়াচ্ছেন- এটা ঠিক নয়।
বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মহসিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রচারণা থেকেই নকল ডিমের গুজব ছড়িয়েছে। আসলে নকল ডিমের কোনো অস্তিত্ব এ দেশে নেই। বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক মশিউর রহমান বলেন, একটি সুস্থ-স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে ডিম খাওয়া বাড়াতে হবে। দুই থেকে তিন বছর আগে একটি ডিমের দাম ছিল ১২ টাকা। এখন সাত থেকে আট টাকায় নেমে এসেছে। সরকার পোলট্রি শিল্প খাতে বিশেষ প্রণোদনা ও ভ্যাটমুক্ত করলে ডিমের দাম আরও কমানো সম্ভব।
ডিমের পুষ্টিগুণ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন, ডিম দেহের পুষ্টিগুণ বাড়াতে ও দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। রক্তে কোলেস্টেরল জমতে বাধা দেয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। মস্তিস্কের কার্যকারিতা ঠিক রাখে। চোখ ও হাড় ভালো রাখে, প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করে। ডিমের সবচেয়ে বড় গুণ, এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। সকালের নাশতায় প্রতিদিন একটি ডিম মানে সারাদিন ক্ষুধা কম হবে। বারডেম হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ডা. রফিকুল ইসলাম রনক বলেন, ডিমে আছে ভিটামিন-এ এটি দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। শুধু ডিমেই রয়েছে ভিটামিন-ডি যা পেশির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। গর্ভবতী মায়েদের প্রতিদিন একটি অথবা দুটি ডিম খাওয়া উচিত। তাহলে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয় না। শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ডিম প্রয়োজন। যেসব নারী সপ্তাহে কমপক্ষে ছয়টি ডিম খান, তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ কম।
বছরে ডিমের ঘাটতি ৪৮৩ কোটি পিস। দেশে প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস ডিমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সে হারে বাড়ছে না উৎপাদন। এখনো দেশে ডিমের ঘাটতি রয়েছে চাহিদার প্রায় ২৯ শতাংশ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
পুষ্টিচাহিদা পূরণে একজন মানুষের বছরে প্রায় ১০৪টি ডিমের প্রয়োজন। সে হিসাবে ২০১৬ সালে দেশে ডিমের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৬৭৪ কোটি ৪০ লাখ পিস। এ চাহিদার বিপরীতে গত বছরে উৎপাদন হয় ১ হাজার ১৯০ কোটি ২৪ লাখ পিস। ফলে গত বছর ডিমের ঘাটতি ছিল ৪৮৩ কোটি ১৬ লাখ পিস, যা চাহিদার প্রায় ২৯ শতাংশ। তবে আশার কথা হলো, ঘাটতির পরিমাণ প্রতি বছরই কমে আসছে। ফলে জনপ্রতি ডিমের প্রাপ্যতাও বাড়ছে। ২০০১ সালে জনপ্রতি প্রাপ্যতা ৩৪টি হলেও গত বছরে তা ৭৫টিতে উন্নীত হয়েছে।
জানা গেছে, মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে ওঠা এবং সরকারের নীতিসহায়তা ডিম উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। দেশে উৎপাদিত ডিমের ৯৫ শতাংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডিম সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু প্রচারণা ও পরিকল্পনার অভাবের কারণে ডিমের কাঙ্ক্ষিত চাহিদা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ বাড়ানো নিয়ে সংশয়ে থাকছেন। আর এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র খামারিরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো. আইনুল হক বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ জনপ্রতি ডিমের প্রাপ্যতা ১০৪টিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এজন্য ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোসহ নেতিবাচক বিষয়গুলোর সমাধান করা হচ্ছে। এছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বড় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে সরকার।
শুধু আমিষের ঘাটতি পূরণ নয়, ডিমের রয়েছে বহুমুখী গুণাগুণ। নিয়মিত ডিম খেলে কমে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। এছাড়া এটি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি এবং ওজন কমাতে সহায়তা করে। নানামুখী গুণাগুণের কারণে দেশে ডিমের চাহিদাও বেড়ে চলেছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স অনুষদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে চারটি ডিম খেলে টাইপ-টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৩৭ শতাংশ কমে যায়। সপ্তাহে ছয়টি ডিম খেলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়। মাত্র দুটি ডিম নারীর দৈনিক প্রোটিন চাহিদার চার ভাগের এক ভাগ পূরণ করতে পারে। শুধু তাই নয়, শর্করা কমিয়ে প্রতিদিন ডিম খেলে মাসে তিন পাউন্ড পর্যন্ত ওজন কমানো সম্ভব। কেননা ডিমে আছে ভিটামিন এ, ই, বি৬, বি১২, ফোলেট, ফসফরাস।
এছাড়া প্রায় সব ধরনের ক্যালসিয়াম, আইরন, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, সেলিনিয়াম, থিয়ামিন, গুরুত্বপূর্ণ সব অ্যামিনো অ্যাসিড ও প্যানটোথেনিক অ্যাসিড। এছাড়া ডিম চোখের জ্যোতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। লিউটিন ও জিয়াজানথিন বার্ধক্যজনিত ক্ষয় রোধ করে। ক্যারোলিন হার্টের রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এজন্য সচেতন মানুষের জন্য বাজারে ওমেগা ও অর্গানিক ডিমের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।
প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি গঠন, সর্বোপরি ডিমের গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার ‘বিশ্ব ডিম দিবস’ পালন করা হয়। আন্তর্জাতিক ডিম কমিশন ও ডিম উৎপাদনকারী অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে এই দিনে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান কর্মসূচি পালন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশেও ‘সুস্থ সবল জাতি চাই, সব বয়সেই ডিম খাই’ স্লোগান নিয়ে ২২তম ‘বিশ্ব ডিম দিবস’ পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আজ সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত প্রতি পিস ৩ টাকা দামে এক লাখ পিস ডিম বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছেন বিপিআইসিসি সভাপতি মসিউর রহমান। তিনি বলেন, দেশের মানুষের পুষ্টি ঘাটতি মেটানো ও দারিদ্র্য বিমোচনে ডিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সাধারণ মানুষের মাঝে ডিম খাওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বাড়লেও তা এখনো সন্তোষজনক নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একজন মানুষ বছরে ২০০টির বেশি ডিম গ্রহণ করে। দেশে তা এখনো অনেক কম। তাই ব্যক্তিপর্যায়ে ডিম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন।
| Sun | Mon | Tue | Wed | Thu | Fri | Sat |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | |
| 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 |
| 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 |
| 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 |
| 28 | 29 | 30 | 31 | |||