admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ৩ এপ্রিল, ২০২১ ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
নাগরিক ভাবনাঃ নির্মাল্য ঘোষ, জলপাইগুড়ি, ভারত থেকেঃ ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছিলাম মায়ের মুখে যে আমাদের উত্তরবঙ্গের আনাচে কানাচে প্রচুর ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। মা ইতিহাসের শিক্ষিকা ছিলেন দেশবন্ধু নগর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। তাই মায়ের মুখে ইতিহসের গল্প ছোটো বেলা থেকেই শুনে এসেছি, বিশেষ করে মা যখন বিভিন্ন সেমিনার থেকে ফিরতেন, তখন নতুন কোনো বিষয়ে আলোচনা হলে আমার সঙ্গে শেয়ার করতেন। আমি তখন ক্লাস নাইন কি টেন এ পড়তাম। আমার শুনতে খুব ভালো লাগত এবং পরবর্তীতে নিজের আগ্রহে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছু তথ্য আমি জোগাড় করেছিলাম উত্তরবঙ্গের প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে যেগুলি এখানে আমি শেয়ার করতে চাই।
সম্প্রতি কয়েকমাস আগে(২০১৮ সালের শেষ দিকে ) কোচবিহারের দিনহাটার গোসানীমারিতে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হল প্রাচীন সামগ্রী। গোসানীমারি এলাকার স্থানীয় কৃষক অজিত বর্মন তাঁর জমিতে একটি উচু জায়গা খুঁড়তে যান৷ অল্প খুঁড়তেই মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসে পুরোনো বিভিন্ন বাসন পত্র।গোসানীমারি কোচবিহারের প্রাচীন এলাকা৷ ঐতিহাসিকদের মতে এখানে পঞ্চদশ শতকে খেন রাজারা রাজত্ব করত৷ এর আগে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এই এলাকায় খনন কার্য চলিয়ে বেশ কিছু প্রাচীন বস্তু ও মূর্তি উদ্ধার করে। মালদহ শহর থেকে ৪৬ কিমি দূরে জগজীবনপুরে পাল বংশের সময়কার এক বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় এবং সেখানে খনন করে প্রচুর টেরাকোটার ফলক ও পোড়া মাটির মূর্ত্তি উদ্ধার হয় যেগুলো বিশেষজ্ঞদের মতে অষ্টম শতকে র। প্রত্ন সামগ্রীগুলো বর্তমানে মালদা ও কলকাতার প্রত্ন সংগ্রহশালায় আছে।
উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরে আমার জন্ম ও বসবাস। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা প্রত্ন সম্পদে পরিপূর্ণ এটি শুনেছিলাম। এখানকার মাটির নীচে অতীত দিনের বহু প্রত্ন নিদর্শন খনন করে পাওয়া গিয়েছে। জোড়াদিঘি বলে একটি জায়গা আছে যেটি জলপাইগুড়ি থেকে একটু দূরে – সেখানে মাটির তলা থেকে প্রায় হাজার বছর আগের একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল এবং সেখান থেকে কষ্টি পাথরের তৈরী আড়াই ফুট লম্বা ও এক ফুট চওড়া একটি বিষ্ণু মূর্ত্তি ও একটি গোপাল মূর্ত্তি পাওয়া যায়। ১৯১৩ সালে জয়পুর চা বাগানে একটি পুকুর খোঁড়ার সময় একটি ৫”×৩” মাপের সেন যুগের মনসা মূর্ত্তি পাওয়া যায় – মূর্ত্তিটির কোলে সাপ ও মাথায় ফনাধারী সাপ।
পাল যুগের শিল্পকীর্তিও উত্তরবঙ্গে পাওয়া গিয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলার বেলকোবা অঞ্চলের খালপাড়া গ্রামে জনৈক কৃষক চাষ করার সময় কষ্টি পাথরের একটি গণেশ মূর্ত্তি পান – প্রায় আট ইঞ্চি লম্বা ও সাড়ে সাত ইঞ্চি চওড়া মূর্ত্তিটি পাল যুগের বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। ১৯৭৩ সালে জলপাইগুড়িতে পাণ্ডাপাড়ার বামনদিঘি সংস্কারের সময় আটটি কুয়া পাওয়া যায়। কুয়োগুলি গড়ে ২৪ ফুট গভীর এবং ভেতরে রয়েছে সুড়ঙ্গপথ। কুয়োর ভেতরে পাওয়া যায় খড়গ, পুরোনো কারুকাজ খচিত কলসী, মশাল, গাদা বন্দুক ইত্যাদি। এই গাদাবন্দুকগুলো কলকাতার যাদু ঘরে আছে।
চাউলহাটিতে একটি অপরিচিত মূর্ত্তির নীচে কিছু প্রাচীন শিলালিপি খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া যায়। ধূপগুড়ি কুর্শাবাড়িতে পাওয়া যায় কালো পাথরের একটি পাল যুগের সূর্য মূর্ত্তি। বেরুবাড়িতে পাওয়া যায় একটি কৃশ উদরের চামুন্ডা মূর্ত্তি – মূর্ত্তিটি
ফনীন্দ্রদেব বিদ্যালয়ের ভেতরে রাখা ছিল, যখন আমরা ছাত্র ছিলাম দেখেছি, এখন কোথায় আছে জানি না। এছাড়া জলপাইগুড়ি শহরের কারিগরী বিদ্যালয়ের মাঠে মাটি কাটার সময় কিছু পুরোনো তৈজসপত্র, সিপাই পাড়ায় ১২ ফুট ব্যাসের একটি ঢোল ইত্যাদি পাওয়া যায়। বেরুবাড়ি সীমান্তে ১৯৬২ সালে পাওয়া যায় উমা মহেশ্বরের একটি মূর্ত্তি। জহিরি গ্রামে একটি সূর্য মূর্ত্তি ও একটি অর্ধ মস্তক মুণ্ডিত মূর্ত্তি পাওয়া যায়। অনুমান করা যায় মূর্ত্তি দুটি পাল রাজত্ব যুগের এবং পরবর্তীতে মূর্ত্তি দুইটি চুরি হয়ে যায় ও পরে রাজগঞ্জ এলাকা থেকে উদ্ধার করেন সেই সময়ের উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক শ্রদ্ধেয় নির্মল চন্দ্র চৌধুরি।
১৯৫১ সালে জল্পেশ সংলগ্ন পুকুরে একটি গোপাল মূর্ত্তি ও একটি বিষ্ণু মূর্ত্তি পাওয়া যায়। চার হাতওয়লা বিষ্ণুমূর্ত্তিটি দুই ফুট লম্বা ও দেড় ফুট চওড়া – মূর্ত্তিটি বর্তমানে নান্দিকেশ্বর মন্দিরে পূজিত হচ্ছে। ১৯৫৮ সালে ভিতরগড়ে একটি চন্ডী মূর্ত্তি পাওয়া যায়।
ডুয়ার্সের চিলাপতা দুর্গের আবিষ্কারের কথা আমরা সবাই জানি যা নলরাজার গড় হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ বেরুবাড়ির নাউয়াটারি গ্রামে পাওয়া দুই ফুট উঁচু মূর্ত্তিটি প্রথম বা দ্বিতীয় শতকের বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। জলপাইগুড়ি জেলার জহিরি গ্রামের পিছনে কীর্তনীয়া পাড়া গ্রামে ২৭ ইঞ্চি লম্বা ও ৭ ইঞ্চি চওড়া দুইটি কষ্টিপাথরের মূর্ত্তি পাওয়া গিয়েছিল। রাজগঞ্জ থানার গৌরীকনা গ্রামে একটি জেলে একটি বিষ্ণু মূর্ত্তি পেয়েছিল। ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে ময়নাগুড়ি থানার রথেরকোট গ্রামে একটি সূর্য মূর্ত্তি পাওয়া যায় – আশ্চর্যের ব্যাপার হল সপ্তঅশ্ব চালিত রথে উপবিষ্ট ঐ সূর্য মূর্ত্তির পায়ে বুট জুতো ছিল। এছাড়াও ময়নাগুড়ি থানার মাধবডাঙ্গা গ্রামে একটি প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, যেখানে সূর্য, বিষ্ণু, মহাদেব, বুদ্ধ প্রভৃতি মূর্ত্তি পাওয়া যায়।
১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসে জলপাইগুড়িতে রাজবাড়ীর কাছে জনস্বাস্থ্য বিভাগের একটি কুড়ি ফুট গভীর নলকূপ খননের সময় গনেশ, বিষ্ণু ও নারায়ণের তিনটি মূর্ত্তি পাওয়া যায়। ১৯৭৯ সালে রাজগঞ্জে একটি সূর্য মূর্ত্তি ও দোমোহনি থেকে কষ্টি পাথরের একটি মূর্ত্তি পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৮২ সালে ময়নাগুড়ি জটিলেশ্বর মন্দিরের পাশে একটি পুকুর খোঁড়ার সময় ১৪ টি মূর্ত্তি পাওয়া যায় যার মধ্যে ১৩ টি পাথরের ও একটি ধাতব। ১৯৭৬ সালে রাজগঞ্জ থানার মাঝিয়ালি অঞ্চলের কায়েতগঞ্জ গ্রামে মাটির তলা থেকে একটি বাইশ ইঞ্চি লম্বা ও বারো ইঞ্চি চওড়া কষ্টি পাথরের সূর্য মূর্ত্তি পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহালয় দপ্তরের উদ্যোগে এবং দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের ব্যবস্থাপনায় দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সদর বালুরঘাট শহরের মম্মথ নাট্য চর্চা কেন্দ্রে এই বছরের জানুয়ারিতে জানুয়ারিতে শুরু হয়েছিল আলোকচিত্রের মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্ব প্রদর্শনী। সেই প্রদর্শনী কর্মসূচীর অঙ্গ হিসাবে প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিন শুক্রবারে বালুরঘাট শহরের নাট্যতীর্থ ভবনে অনুষ্ঠিত হল ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্বের উপর একটি বিশেষ কর্মশালা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকজন সারা রাজ্য জুড়ে কাজ করছেন, প্রত্ন নিদর্শন গুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছেন, আমরা কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে। আমি যেটুকু জানি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্ষয় মৈত্র সংগ্রহশালা বলে একটি সংগ্রহ শালা রয়েছে, কিন্তু সেখানে উত্তরবঙ্গ থেকে উদ্ধার হওয়া সব মূর্ত্তি নেই। হয়ত কলকাতার সংগ্রহ শালায় আছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের মানুষকে কোলকাতা গিয়ে নিজেদের উদ্ধার হওয়া প্রত্ন সামগ্রী দেখার থেকে উত্তরবঙ্গে আরো বেশী বেশী সংগ্রহ শালা হলে আমার মনে হয় ভালো হবে। আর প্রত্নসামগ্রীর চোরাপাচারকারিদের ব্যাপারে সরকারকে আরো সতর্ক হতে হবে এবং ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।