admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২ ডিসেম্বর, ২০২১ ১০:০০ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনা, এ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীনঃ ৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত দিবস। ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠি র কৃতিত্ব। মহান বিজয় দিবসের সূবর্ণ জয়ন্তীতে গর্ব করার মতো ঘটনাই ঘটলো। ৭১ সালে ৯ মাসের যুদ্ধের পর আমাদের প্রিয় মাতৃভুমির বিজয় অর্জিত হয়। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিসেম্বরের জন্য অপেক্ষা করেনি। ৭১ এর ডিসেম্বরের ৩ তারিখেই ঠাকুরগাঁও জেলাকে হানাদার মুক্ত করে।
২০১০ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী পুনর্গঠিত হয়। ২০১১ সালে প্রথম বারের মতো ঠাকুরগাঁও উদীচী ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার মুক্ত দিবস উদযাপন করতে শুরু করে। হানাদার মুক্ত দিবসের তারিখটিও জনসমক্ষে ছিলনা। নির্ধারিত তারিখ নিয়ে ঐক্যমত্য হয়নি। অবশেষে এই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় ঠাকুরগাঁও মুক্ত দিবস ৩ ডিসেম্বর। ঠাকুরগাঁও জেলা সদরে অনেক কিছুর প্রাপ্তি ঘটেছে স্বাধীনতার ৪০ বছর পর। যেমন ৭ বীর শ্রেষ্ঠ ম্যুরাল , কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, বড় মাঠে আলোর ব্যবস্থা , অপরাজেয় ৭১ , ভাষা সৈনিক দবিরুল ইসলামের স্মৃতি ফলক সংস্কার এ সব প্রয়োজনীয় স্থাপনা পাওয়ার জন্য ঠাকুরগাঁও বাসীকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪০ বছর।
ঠাকুরগাঁওয়ে এক সময় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী বেশ সচল ও সক্রিয় ছিল।
ঠাকুরগাাঁয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অংগনে সরব উপস্থিতি ছিল। নাট্য হলে নিয়মিত নাটক হতো। সব সংগঠনেরই সময় অসময় থাকে। উদীচীও বাদ যাবে কেন? বিভিন্ন কারনে উদীচী নিস্ক্রিয় হয়ে পরে। কিশোর বয়সে ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সেতারা বেগমের পদচারনা ছিল। নজরুল সঙ্গীতের শিল্পী হিসাবেই পরিচিতি পেয়েছিলেন। ছাত্র রাজনীতি করেছেন , ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হয়ে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পর কর্মজীবনে ঠাকুরগাঁও ছাড়তে হয়েছিল। এ সময় ঠাকুরগাঁও সাংস্কৃতিক অঙ্গনও কেমন জানি ঝিমিয়ে পরে।
কর্মজীবনে বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করার কারনে দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারনে ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রায় অপিরিচিত মুখ হয়ে যান। সরকারি নিয়মে বদলী হয়ে ঠাকুরগাঁও ফিরে আসলে সমসাময়িক প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীরা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন। সেতারা বেগম দায়িত্ব গ্রহণ করেন রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষেদের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে । সম্মিলন পরিষদের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপুর্ন অনুষ্টানের সফল আয়োজন করা হয়। ২০১০ সালে সেতারা বেগমকে আহবায়ক করে নুতন করে যাত্রা শুরু করে উদীচী। কমিটি গঠনের পর থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে কেন্দ্রের নির্দেশনা এবং স্থানীয়ভাবে জাতীয় দিবস বিশেষত: বিজয় , স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবসে প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রচনা , আলোচনা , নির্বাচিত কবিতা আবৃত্তি , সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান , দেশাত্ববোধক গানের প্রতিযোগিতা , ছবি আঁকা , ব্যপক প্রশংসা অর্জন করে। গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রীক এই আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যাধিক্যের কারনে উৎসবমুখর হয়ে পরে। এই আয়োজন দারুন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
বাল্য বিবাহ , মানবতা লংঘিত হলে , কোন এলাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হলে বিভিন্ন ইসুতে মানববন্ধন , প্রতিবাদ সভা , পথসভা , শোভাযাত্রা , ঢাকা ঠাকুরগাঁও আন্তনগর ট্রেন চালুর দাবীতে পঞ্চগড় -বোচাগঞ্জ বিশেষ ট্রেন মিছিল , এলাকার মানুষের মনে ব্যপক দাগ কাটে। প্রতিবছর প্রত্যন্ত অঞ্চলে শীতার্ত মানুষের মাঝে শীত বস্ত্র বিতরণ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ জনগোষ্ঠির মাঝে খাবার বিতরণ , বিশেষত: বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানয়ের ১৭ টি পরিবারে ঘর করে দেওয়া একটি বড় পদক্ষেপ। সাংস্কৃতিক সংগঠন হলেও আর্ত মানবতার পাশে ঠাকুরগাঁও উদীচী রয়েছে।
এর পর ২০১১ সালে উদীচীর সামনে আসে ৩ ডিসেম্বর। ঠাকুরগাঁও বাসী ভুলতেই বসেছিল ৩ ডিসেম্বরের স্মৃতি। ৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাাঁও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন থেকে মুক্তির দিন। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হলেও তার অনেক আগেই আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা তা সম্ভব করে। একাত্তরের এই দিনেই বীর মুক্তিযোদ্ধারা ঠাকুরগাঁওকে তাদের কবল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রথমবারে আয়োজনের জন্য হাতে সময় কম থাকলেও সকল স্তরের মানুষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন , মুক্তিযোদ্ধা সংসদ , রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ , সাংবাদিক , সুশীল সমাজের প্রতিনিধি , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান , প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়াকর্মী , সবাইকে সংগে নিয়ে উদীচী পালন করে দিনটি। সবাই স্বত:স্ফুর্ত সমর্থন দিয়েছে। প্রথম আয়োজনে সাবেক এমপি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক , আলহাজ ফজলুল করিম আয়োজনের উদ্বোধন করেন। ২০১১ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ পর্যন্ত ১০ম বারের মতো ধারাবাহিকভাবে দিনভর এই আয়োজন পালিত হয়। কর্মসুচির মধ্যে থাকে সকালে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ , অপরাজেয় ৭১ , শহীদ মোহাম্মদ আলীর মাজার , নরেশ চৌহানের সমাধিতে বিশেষ কায়দায় এবং গভীর শ্রদ্ধায় পুস্পস্তবক অর্পন করা হয়। এর পর আনন্দ শোভাযাত্রা, মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শনী যেটি প্রতিবছরই যতেœর সাথে আয়োজন করেন শহীদ পরিবারের সন্তান উদীচীর সদস্য জালাল উদ্দীন।
বিকেলে আলোচনা সভায় সংসদ সদস্যগণ , মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকগণ , রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ , মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধি , সুশীল সমাজের প্রতিনিধি জেলা প্রশাসক , পুলিশ সুপার অংশগ্রহণ করেন। উদীচীর মতো একটি সংগঠন এই দিনে এলাকার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাকে দর্শকের সামনে হাজির করে , তাঁর স্মৃতিচারনমুলক বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। জাতীয় জীবনে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনেকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা এবং অবদান রাখার জন্য উদীচী যেমন ২১ শে পদকে ভুষিত হয়েছে তেমনি স্থানীয় পর্যায়েও মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রদানের তালিকা এবং সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাথে পরিচিত হবার পর ঠাকুরগাঁও বাসী অবাক হয়ে যায় তাদের নিভৃতচারীতার সাথে, বলতে গেলে তারা লোক চক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেছে।
এই অনুষ্ঠানে উদীচী প্রতিবছরই সীমিত শক্তি দিয়ে ৫-১০ টি করে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় সেলাই মেসিন দিয়ে সহায়তা করে থাকে। এ পর্যন্ত শতাধিক পরিবারকে সেলাই মেসিন দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলার প্রয়াস এবং অর্ধ শতাধিক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের জেলা বাসীর সংগে পরিচিত করেছে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বর্ধনা প্রদানের মাধ্যমে। ২০১১ থেকে ২০২১ নিরবচ্ছিন্নভাবে উদীচী ঠাকুরগাঁও জেলা সংসদ এই দায়িত্বটি পালন করে আসছে। প্রতিবারের আলোচনা সভায় অংশ নিয়েছেন রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি , বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাগণ । দেশী বিদেশী শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বর্নাঢ্য আয়োজন ছাকুরগাঁও বসিীর মনে দাগ কেটেছে।
এবারের আয়োজনে এগিয়ে এসেছে জেলা প্রশাসন , তারা শোভাযাত্রা করবে, ঠাকুরগাঁও বিজিবি এবং ই এস ডি ও ভিন্ন আঙ্গিকে ৩ ডিসেম্বরের কর্মসুচি পালন করছে। ঠাকুরগাঁও বাসীর গৌরবের এ আয়োজনে আগামীতে হয়তো আরো অনেকে শামিল হবে , কিংবা স্বাধীনভাবে পালন করবে। ৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও পাকিস্তান হানাদার মুক্ত দিবসের কর্মসুচি পালনে অন্যদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারাটাই উদীচীর কৃতিত্ব।