admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২ মার্চ, ২০২৪ ৪:৫৯ অপরাহ্ণ
সেখ আজিজুল,স্টাফ রিপোর্টার,বর্ধমান: ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃৃৃভাষা দিবস ঘোষণা করার ২ যুগ পর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের হাতে অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে, প্রভাত ফেরি শেষে ভাষা সৈনিকদের শ্রদ্ধা জানিয়েছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলা ভাষাভাষি শিক্ষার্থীরা এবারে শ্রদ্ধার সাথে ২১ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করেছে। বাংলা বিভাগীয় প্রধান শ্বাশ্বতী গাঙ্গুলীর সার্বিক তত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরান্ডা হাউসের ফরেন স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন এবং বাংলা ডিপার্টমেন্টের অগ্রনী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী যৌথভাবে মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের কর্মসুচি আয়োজন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত কোন শহীদ মিনার তৈরি না হওয়ায় তারা ক্যাম্পাসে নিজেরা অস্থায়ীভাবে শহিদ মিনার তৈরি করে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অন্যান্য সংগঠনকে কর্মসুচিতে অংশগ্রহণের আমন্ত্রন জানায়। তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে দিল্লি স্টেট বন্ধু সভার সদস্যগণ ছাড়াও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের,থাইল্যান্ড, নাইজেরিয়া,শ্রীলংকার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।
সকালে প্রভাত ফেরি শেষে প্রথম বারের মতো ছাত্রীদের নির্মিত অস্থায়ী শহিদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পন করা হয়। প্রভাত ফেরীতে প্রখ্যাত কলামিস্ট, সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা, শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুরে, ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ এই কালজয়ী গানের সুরে প্রভাতফেরী শেষে ভাষা শহিদ মিনারে পুস্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। শহিদ মিনারের পাশে তারা সুন্দর একটি ব্যানারও স্থাপন করে।
পুস্পস্তবক অর্পণ শেষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় , ভাষা আন্দোলনের পটভুমি,ভাষা আন্দোলনে নারীর ভুমিকা বিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফারিহা আফরিন ঐশী এবং সুমাইয়া রহমান। কবিতা আবৃত্তি করেন , মুদ্রা ব্যানার্জী,নীলাঞ্জনা বাগচী।নৃত্য পরিবেশন করেন, ঋত্বিকা রায় চৌধুরী আলোচনা সভা শেষে সমবেত দেশাত্ববোধক সংগীত পরিবেশন করেন নিলাঞ্জনা বাগচী, ফারিহা আফরিন ঐশী, প্রীতিষা নস্কর,পিরমইকিম পাংখোয়া পপি , শিউলি , সিমরণ গরাং,আলিনা,শতাব্দী দে,লিন্ডা।
প্রথম আলো বন্ধু সভার পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন, সন্দিপা দাস,সুজিত পাল,রিমাইয়া রিমি,মাইশা মেহজাবিন,অর্পিতা রায়,নিশি আক্তার।অনুষ্ঠানে শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে বাংলা ডিপার্টমেন্টের প্রধান শ্বাশ্বতী গাঙ্গুলী,সুকান্ত ঘোষ,অরিজিত কুন্ডু,দেবযানী রায়, পাপ্পুসোনা গান্ধী,তমন্না এমই আলোচনা করেন।
আলোচকবৃন্দ বলেন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি দেশের জন্ম দিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় ২৭ কোটি মানুষ এই বাংলা ভাষায় কথা বলে। যার মধ্যে ১৬ কোটি মানুষ বাস করে বাংলাদেশে। ১৯১৩ সালে বাংলা ভাষার লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকে।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে বাংলা ভাষাকে বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য গৌরবের আসন দিয়েছে।
ভাষার জন্য এমন কেের রক্ত ঢেলে দেওয়ার ইতিহাস খুব বেশী জাতির নেই। আমাদের অহংকার তো সেখানেই। বাংলা ভাষাভাষীরা সেজন্য গর্ব বোধ করতেই পারে।একুশই বাঙালী জাতির ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম গর্বের,শক্তির এবং অনুপ্রেরনার জায়গা। ওই একুশেই প্রোথিত হয়েছিল স্বাধীনতার বীজ। সোজা কথায় একুশের শক্তি দিয়েই এই ভাষার মধ্যে দিয়েই মানুষের মনে ঐক্যবদ্ধ চেতনার জন্ম দিয়ে হয়েছিল বাংলাদেশের জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ভাষার জন্য জীবন দানকারী আর কোন দেশ পৃথিবীতে নেই। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ পেরিয়ে ৭১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরকার এবং জনগন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এক গৌরবোজ্জল ভুমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের বহু সৈনিককে জীবন দিতে হয়েছে। তাঁদের আত্মত্যাগে বাংলাদেশ ভারতের বন্ধুপ্রতীম দেশ।
পৃথিবীতে বর্তমানে মোট ভাষা প্রায় ৬৯০০। তবে প্রতিনিয়ত ছোট ছোট ভাষাগুলির বিলুপ্তি ঘটছে। এমন ভাষাও আছে যে ভাষায় ১ জন বা ২ জন কথা বলে। তাদের কোন লিখিত ভাষা নেই। তাদের মৃত্যুর সাথে সাথে সেই ভাষাও হারিয়ে যাচ্ছে। এই সব ভাষাকে রক্ষা করার জন্য ইউনেস্কো ২৮ টি রাষ্ট্রের লিখিত সমর্থন এবং ১৮৮ টি দেশের অনুমোদনে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।দেশগুলো হলো: ভারত, ইন্দোনেশিয়াবেনিন,বাহামা,বেলারুশ,কামোরোস,চিলি , ডোমিনিকান রিপাবলিক,মিশর,জাম্বিয়া,হন্ডুরাস,ইতালী ,ইরান,আইভরিকোষ্ট,লিথুনিয়া,মালয়েশিয়া, মাইক্রোনেশিয়া,ওমান,ফিলিপাইন,সৌদি আরব, পাকিস্তান,পাপুয়া নিউগিনি,প্যারাগুয়ে, শ্রীলঙ্কা,রাশিয়া, সুরিনাম,শ্লোভাকিয়া ও ভানুয়ার্তো।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মাধ্যমে সব ভাষাভাষী মানুষদের ভাষার মর্যাদা স্বীকৃত হয়েছে। পৃথিবীর বিলুপ্তপ্রায় ভাষাকে রক্ষা করার জন্য ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউ প্রতিষ্টা করা হয়েছে।
আলোচকবৃন্দ আরো আশা পোষণ করেন, যেহেতু ২১ ফেব্রæয়ারি আন্তর্জাতিক মুতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে সারা দুনিয়ায় পালন হচ্ছে সে কারণে সকল ভাষাভাষীর এ দিবস পালন করা উচিত। সে কারণে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ শীঘ্রই ১টি শহিদ মিনার নির্মান করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ফরেন স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন আশা প্রকাশ করে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন কর্তৃপক্ষ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে ১টি শহিদ মিনার নির্মান ত্বরান্বিত করবে। ভবিষ্যতে হাই কমিশনার প্রতিনিধি দলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান সুচিতে আমন্ত্রন জানানো হবে। আলোচকবৃন্দ ফরেন স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন এবং অগ্রনী সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠান আয়োজনে ফারিহা আফরিন ঐশী,তৃপ্তি রুদ্র পাল,নীলাঞ্জনা বাগচী,সুমাইয়া রহমান মুখ্য ভুমিকা পালন করেন। সহযোগিতা করেছেন সুনয়না সাঁতরা , প্রীতিষা নস্কর,পিরমইকিম পাংখোয়া পপি,ঈষা, সাথী।
পরে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান পরিচালিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে নির্মিত ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। সব শেষে ভারত এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করা হয়।গত বছরও ২১ফেব্রুয়ারিতে ছোট পরিসরে সংক্ষিপ্ত ভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা হয়েছিল। উল্লেখ করা যেতে পারে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরান্ডা হাউস প্রথম বারের মতো অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে রইল।ভবিষ্যতে নিশ্চয় অনেক বড় শহীদ মিনার তৈরি হবে।