admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ, ২০২২ ৯:৫৫ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনা, Hossain Sohelঃ ধানের জমিতে পানি না পেয়ে কৃষকের আত্মহত্যা। বিষপানে এদের একজনের মৃত্যু হলেও অপরজন বেঁচে যান। দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে পানির সঙ্কট ও আত্মহত্যা। রাজশাহী গোদাগাড়ীতে দুই আদিবাসী কৃষক বিষপান করেছে। এদের মধ্যে অভিনাথ মার্ডি নামের একজন মারা যান। অপরজন রবি মার্ডিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন। দুজনের বয়স যথাক্রমে ৩০ ও ৩২ বছর। গত বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গোদাগাড়ী নিলঘটু গ্রামে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকুপের সামনে তারা বিষপান করে।
নিহত অভিনাথ মার্ডি ঈশ্বরীপুর মাঠে ধানের জমিতে পানি দেওয়ার জন্য বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকূপের অপারেটর শাখাওয়াত হোসেনের কাছে ১২-১৪ দিন পানির জন্য ধর্না দেয়। প্রতিদিন পানির জন্য হাহাকার করতে থাকে অপরেটর শাখাওয়াতের নিকট কিন্তু তারা পানি পায়না। এরমধ্যে জমির পানি শুকিয়ে ধানের জমি সাদা হয়ে গেছে। ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বুধবার বিকেলে পুনরায় ডিপ কল অপারেটর সাহেবকে পানির জন্য বলেন। শত অনুরোধের পরও অপারেটর পানি দেয়নি।
চোখের সামনে দিনের পর দিন মাকে (মাটি) এক ফোঁটা পানি দিতে ব্যর্থ হয়ে গভীর নলকুপের পাশেই অভিমান ও কষ্টে অভিনাথ মার্ডি ও রবি মার্ডি বিষপান করে। স্থানীয়রা বলেন পানি সঙ্কট যেমন রয়েছে তেমনি বরেন্দ্র সেচ কর্তৃপক্ষ সেই সঙ্কট আরও একধাপ বাড়িয়ে দেয় টাকা হিসেব নিকেশে। কয়জন সহ্য করতে পারবে যদি চোখের সামনে আপনার মা পানির জন্য হাহাকার করছে কিন্তু পানি খাওয়াতে পারছেন না! কৃষকের কাছে জমি তো মায়ের আরেক নাম। হাতে পায়ে ধরেও বরেন্দ্র ডিপ অপারেটর শাখাওয়াত এক ফোঁটা পানি দেয়নি।
গোদাগাড়ী মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম বলেন, ওই গভীর নলকুপের অধীনে ১৭০ জন কৃষকের ২৬৫ বিঘা জমি রয়েছে। সিরিয়াল অনুযায়ী পানি দিতে হয়। খরা মৌসুমে সিরিয়াল পেতে দেরি হয়। ওসি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে বিষপানের কথা বলা হলেও আদও তারা বিষপান করেছে না অন্য কোন কারণে অসুস্থ্য হয়েছে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসন ও বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে তারা বিষপান নয় মদপান করে। মদপানে তাদের একজন মারা যায় অপর জন হাসপাতালে। উপজেলা প্রশাসক তো সরাসরি এই বিষয়টি নিয়ে কথা না বলতে নিষেধ করেছেন সংবাদকর্মী রাশেদুল রুশোকে। একজন উপজেলা নির্বাহী কিভাবে এমন কথা বলেন! পানি সঙ্কট ও সরবরাহে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে রীতিমতো কৃষককে বিষপানে বাধ্য করা হয়েছে। এ বিষয়টি আর লুকানোর কিছু নেই। ওদিকে এক শ্রেণীর সাংবাদিকরা স্পটে না গিয়ে ধরেই নিয়েছেন যে, আদিবাসি দুজন মদ খেয়েছে ও তাদের একজন মদের কারণে মৃত্যু হয়েছে। এভাবে ধরাধরি করে তারা বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চান।
একদিকে রাষ্ট্র যেমন আদিবাসিদের পিছনে রেখেছে দলিত মথিত করে। তেমনি সেই সিস্টেমের সকলে এক রেখাতে হুজুর হুজুর করে চলেছে। তাইতো আদিবাসি কৃষক হোক বা শ্রমিক কি যায় আসে। আমি বলতে চাই যারা বিষপান করছে তারা আদিবাসিরও আগে প্রথমত বাংলার কৃষক। কৃষি ও কৃষকের সাথে প্রথম স্তরে জড়িয়ে আছে পানির স্তর। কোন প্রাণ যদি পানি না পায় তো কোন উৎপাদন তার দ্বারা সম্ভব নয় ঠিক মৃত্যু ছাড়া। জমিতে যদি কোন উৎপাদন ঘটাতে হয় আগে মাটির সাথে রসের বিনিময় ঘটাতে হবে। তারপর উৎপাদিত ফসলের প্রত্যাশা করতে হয়। এবং এসব পূর্ণতা একদিনে নয় বরং দিনের পর দিন পিপাসা মুক্ত হয়ে একদিন সবুজের ফসল হলুদে রুপান্তরিত হয়।
কৃষক অভিনাথ মার্ডি ও রবি মার্ডিকে একপ্রকার মানসিক নির্যাতন করে বিষপানে বাধ্য করেছে বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। আর সেই হত্যায় মদদ দিয়েছে বা দিচ্ছে স্থানীয় রাজ্যের রাজা সেনাপতি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। অবশ্যই উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা ও বরেন্দ্র সেচ কর্তৃপক্ষকে কৃষকের বিষপান ও আত্মহত্যার সঠিক জবাব দিতে হবে। বিষপানে আত্মহত্যাকে মদপানের হত্যা বলে চালিয়ে দেয়া যাবেনা। এদিকে মাত্র তিনদিন আগে ঘটা করে পালন করা হলো বিশ্ব পানি দিবস। পানি দিবস ঘিরে নানান আয়োজনের ভীড়ে কিছু কথা বা বার্তাও দিয়েছেন নদী পানি নিয়ে যারা কাজ করেন। কিন্তু সরকার কি ভাবছে?
লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক শেখ রোকন গেল তিনদিন আগে একটি কলামে লিখেছেন, আবহমানকাল থেকে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের প্রধান শস্য ধানের প্রধান মৌসুম ছিল বর্ষাকাল ঘিরে। বর্ষার আগে হলে আউশ, আর পরে হলে আমন। কথিত সবুজ বিপ্লবের নামে এলো কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থা। ভূপৃষ্ঠের জলাভূমি থেকে কায়িক সেচ ব্যবস্থার জায়গায় এলো ভূগর্ভস্থ পানি তোলার পাম্প। প্রথমে ডিপ টিউবওয়েল, তারপর শ্যালো টিউবওয়েল। আশির দশকেও যেখানে কমবেশি পাঁচ হাজার ডিপ টিউবওয়েল ছিল; এখন সেটা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। শ্যালো টিউবওয়েলে ‘প্রবৃদ্ধি’ আরও ব্যাপক। আশির দশকের দুই লাখ শ্যালো টিউবওয়েল মাত্র চার দশকে আট গুণ বেড়ে ১৬ লাখ ছাড়িয়েছে। এসব যে নিছক সংখ্যা নয়, বরং ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির সূচক- এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
যাইহোক, কৃষকের আত্মহত্যা কিংবা তাদের উপর নির্যাতন কোনকালেই কোন সুফল বয়ে আনেনি। বরং সরকার ও তার নীতিবাক্য প্রেরণকারীরা বিতর্কিত হবেন। বরং খেয়াল রাখুন পাশের দেশ ভারতের কৃষকদের আত্মহত্যার চিত্র।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্যে ভয়াবহ। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০১৯ সালেই ভারতে ৪২,৪৮০ জন কৃষক ও দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন।পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতাজনিত মানসিক চাপ ও হতাশার মোকাবিলা করার শক্তি মানুষ যখন হারিয়ে ফেলে তখনই আত্মহত্যার মতো অন্তিম পদক্ষেপ বেছে নেয় মানুষ৷ ভারতে আত্মহত্যার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছে কিষান মিত্র’ ব্যানারে নানান সংগঠন।
তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, কৃষকের পানি সঙ্কট, সার সঙ্কট, ফসল ভালো না হওয়া এবং চাষের জন্য নেয়া ঋণ কৃষকদের আত্মহত্যার অন্যতম কারণ৷ অতএব আমরা কোন পথে যাবো তার ভাবনা এখন থেকে ভেবে তা বাস্তবায়নের রুপরেখা তৈরী করতে হবে। কৃষকের আত্মহত্যার আর্ন্তজাতিক সংবাদের শিরোনাম না হয়ে বরং এশীয় মহাদেশে পানি সঙ্কট মোকাবেলায় কিভাবে দৃষ্টান্ত রাখা যায় তার ধারনাপত্র তৈরী করা উচিত। সেই সাথে রাজশাহী গোদাগাড়ীতে পানি না পেয়ে কৃষকের আত্মহত্যার সঠিক প্রতিবেদন ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
২৫ মার্চ ২০২২