admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২২ ৭:২৯ অপরাহ্ণ
নাগরিক ভাবনা: অ্যাডভোকেট আবু মহী উদ্দীনঃ ঠাকুরগাঁওয়ের গরীবের ডাক্তার বলে খ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শাহজাহান নেওয়াজ সরকারি চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। মেঘে মেঘে বেলা বেড়ে তাঁর বয়স ৬০ বছর হয়ে গেছে তা আমরা বুঝতেই পারিনি। তিনি চাকুরী জীবনের অধিকাংশ সময়ই ঠাকুরগাঁওয়ে আছেন এবং এই এলাকার শিশুদের নির্ভরযোগ্য ডাক্তার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। অন্যান্য ডাক্তারের মতো সরকারি হাসপাতালে চাকুরী করলেও তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতেন। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা অনেক ডাক্তার রোগির ফাইলের সাথে ৫০০/৬০০ টাকা ফি সহ না দিলে কোন রোগি সিরিয়াল পায়না। ডাক্তার শাহজাহান নেওয়াজের কোন ভিজিটের রেট নাই।
কে কত ভিজিট দেয় বা দিল বা দিলনা তা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নাই। তার কোন হিসাব তিনি করেননা। হাসপাতালের চাকুরীর বাইরের সময় মানুষ সেবা পেতো। এখন তার চাকুরী নাই। এখন মানুষ আরো বেশী সেবা পাবে। কেননা তার আর ট্রেনিং থাকবেনা , ওয়ার্কশপ, সেমিনার,রাউন্ড, বদলী থাকবেনা । ফলে সব সময়ই তাকে পাওয়া যাবে। আল্লাহ পাক তাঁর হায়াত দারাজ করুন এবং সুস্থ্য রাখুন। দীর্ঘদিন তিনি আমাদের শিশুদের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে থাকুন।
ঠাকুরগাঁও শহরে আরো গরীবের ডাক্তার আছেন। তার মধ্যে এমবিওরো ডেন্টাল সার্জারীর স্বত্বাধিকারী ডাক্তার মনজুর আলম। তিনি ইচ্ছে করলে আরো অনেক লোভনীয় , আকর্ষনীয় আর্থিক দিক থেকে লাভবান দ্বায়িত্ব পালন করতে পারতেন। সে সব উপেক্ষা করে তিনি তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে চেম্বার ও ক্লিনিক করেছেন। দাঁতের চিকিৎসায় উচ্চতর অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে বেশ দক্ষ ও অভিজ্ঞ। তিনি চাকুরীতে যেতে পারতেন , যে কোন শহরে জেঁকে বসে প্র্যাকটিস করতে পারতেন। তার সাথে অনেকবার আলোচনা হয়েছে। তিনি তার ক্লিনিককে আধুনিকায়ন করেছেন। অন্য ডাক্তাররা হয়তো অনুরোধে ভিজিট কম নিতে পারেন , কিন্তু তিনি নোটিশ দিয়ে ভিজিট কম নেন।
তার চেম্বারে নোটিশ দেওয়া আছে , “যাদের আর্থিক সমস্যা আছে , তারা যেন অকপটে খুলে বলেন”। আত্মীয় স্বজন , তাদের আত্মীয় স্বজন , এলাকা বাসী তাদের জন্য একদম ফ্রি। কোন কোন ক্ষেত্রে উপকরণের দামও নেননা। মসজিদ , মাদরাসা এতিমখানায় আর্থিক সহায়তা দিয়ে নিজে পরিচালনা করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীরা প্রায়ই বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ পেয়ে থাকে। কয়েক বছর আমি একটি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ হিসাবে দ্বায়িত্ব পালন করেছিলাম। সে সময় তাকে আমন্ত্রন জানিয়ে ছিলাম কলেজে। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন এই কলেজের ছাত্র শিক্ষক এবং তাদের অভিভাবকরা বিনা মুল্যে দাঁতের চিকিৎসা পাবেন। মনে হয়েছিল এটা বোধ হয় অন্যান্য রাজনৈতিক ঘোষণার মতোই হবে। খুবই সন্তুষ্টির বিষয় দীর্ঘদিন তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র শিক্ষক অভিভাবকদের বিনা মূল্যে দাঁতের চিকিৎসা করেছেন।
দাঁতের চিকিৎসা ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ। বেশ ধৈর্য ধারণ করতে হয়। আন্তরিকার ছোঁয়া পেয়ে রোগিরা একটু বেশীই আসেন। ফলে ভীড় বেশি। তাঁর অভিজ্ঞতার একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। দ্বিতীয়বার আমার কোভিড হয়েছিল। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আবার দাঁতের সমস্যা নিয়ে তার কাছে গিয়েছিলাম। তিনি চিকিৎসা দিয়েছেন এবং আমি বাসায় এসেছি। কষ্টকর বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে বাধ্য হয়ে পরের দিন তার কাছে আবার গেলে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তিনি বলেন “আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। আমি জানি আপনি সারা রাত ব্যাথায় কষ্ট করেছেন কিন্তু আমার কিছু করার নাই। কোভিড চিকিৎসায় যতো উচ্চ মাত্রার এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে এর উপরে আর কোন এন্টিবায়োটিক ঔষধ দেশে নাই। সারা রাত ভেবেছি আমি ডাক্তার , আমি বুঝি কিন্তু কিছু করতে পারছিনা
একজন চিকিৎসক যদি তার রোগি সম্পর্কে এই রকম সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেন তাহলে তিনি অবশ্যই রোগির ভরসাস্থল হিসাবে বিবেচিত হবেন এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যপারে আমাদের একটা প্রত্যাশা থাকতেই পারে। তা হলো এই জাতীয় চিকিৎসক যেন ভালো পরিবেশে ঠাকুরগাঁওয়ে থাকতে পারেন তারা যেন কোন কারণে বিরক্ত বোধ না করেন সে ব্যবস্থা করা আমাদের দ্বায়িত্ব। এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, শহরবাসী যার যার অবস্থান থেকে সহায়ক ভুমিকা পালন করতে হবে। যে দুজন চিকিৎসকের কথা এখানে লিখলাম , খুব জোরের সাথে বলতে পারি, টাকা নাই , ডাক্তারের ফি দিতে পারে নাই এ রকম কেউ চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে এমন ঘটনা কোন দিন ঘটেছে বলে কোন নজীর নাই। আরো যারা সমাজের গরীবদের চিকিৎসা প্রার্থীদের জন্য কাজ করছেন তাদের কথাও লিখতে চাই।