মনসুর আহাম্মেদ,ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ৬:২৮ অপরাহ্ণ
ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জ এ জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে যখন প্রতিটি মানুষের একটু উষ্ণতা, আর বিশ্রামের প্রয়োজন, ঠিক তখনই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন প্রায় ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা বিমলা রানী। স্বামী মারা যাওয়ার পর শেষ সম্বলটুকু, অর্থাৎ স্বামীর ভিটেমাটিও তার কপালে জোটেনি।
সন্তানহীন এই বৃদ্ধা মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন পুকুরপাড়ের এক নির্জন স্থান। সেখানে ভাঙা টিন ও বেড়ার একটি জীর্ণ কুঁড়েঘরে রোদ-বৃষ্টির সাথে লড়াই করে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী এই ঘটনাটি ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ২নং কোষারাণীগঞ্জ ইউনিয়নের রামদেবপুর গ্রামের।
সরেজমিনে রামদেবপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বিমলা রানীর শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা জটিল রোগ। চোখেও ঠিকমতো দেখতে পান না। কোমরের তীব্র ব্যথায় সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও হারিয়েছেন তিনি। ভাঙা কুঁড়েঘরটির সামনে স্যাঁতসেঁতে মাটিতে বসে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।
বৃদ্ধার বসবাসের পরিবেশ অত্যন্ত করুণ।
ঘরের চালে থাকা ভাঙা টিন ও বেড়ার ফাঁক দিয়ে অনায়াসেই বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢোকে। মেঝের ওপর ন্যূনতম কোনো বিছানাপত্র নেই, একটি ছেঁড়া বস্তা আর পুরনো কাপড়ের ওপর কষ্টে তার রাত পার হয়। যেখানে তার চেহারায় ফুটে ওঠা রাজ্যের ক্লান্তি আর হতাশা যে কারও হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।
কীভাবে এই পুকুরপাড়ে এলেন বিমলা রানী এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায় এক করুণ ইতিহাস। স্থানীয়দের দাবি, স্বামীর মৃত্যুর পর বিমলা রানী তার ন্যায্য অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন। নিঃসন্তান হওয়ার অজুহাতে স্বামীর ভিটেবাড়িতে তার জায়গা হয়নি। দীর্ঘকাল ধরে তিনি এই নির্জন পুকুরপাড়ে একাকী বসবাস করে আসছেন।
নিজের অতীত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিমলা রানী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি তার কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, “স্বামী মারা যাওয়ার পর আমার আর কেউ খোঁজ রাখেনি। বাধ্য হয়ে এই পুকুরপাড়ে খুপরি ঘরটি তুলেছি। আগে হেঁটে মানুষের কাছে হাত পাততাম, যা পেতাম তা দিয়ে আধপেটা খেয়ে বেঁচে ছিলাম। এখন তো উঠতেই পারি না, খাব কী?” চিকিৎসার অভাবে দিন দিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন বলেও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
বিমলা রানীর এমন পরিণতিতে স্থানীয় প্রতিবেশীরাও চরম মানবিক উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন। রামদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম ও রমেছা বেগম এই প্রতিবেদকের কাছে পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, “উনার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি অনেক অসহায়। আমরা এলাকাবাসী এতদিন যতটুকু পেরেছি খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু উনার এখন যে শারীরিক অবস্থা, তাতে সার্বক্ষণিক একজন মানুষের প্রয়োজন। উনার ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ে, ঘুমানোর জায়গা নেই। আমরা নিজেরাও গরিব মানুষ, কতটুকুই বা করতে পারি!
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিমলা রানীর আর হয়তো চাওয়া-পাওয়ার তেমন কিছু নেই। তবে একটু নিরাপদ আশ্রয়, দুমুঠো খাবার আর বিনা ব্যথায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগের অধিকারটুকু অন্তত তার প্রাপ্য। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সামান্য সহানুভূতিই পারে এই বৃদ্ধার শেষ দিনগুলোকে একটু স্বস্তিদায়ক করতে। এ অবস্থায় বৃদ্ধার চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসার আহব্বান স্থানীয়দের।