admin || মুক্ত কলম সংবাদ
প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২০ ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ
রিড্ডিউন নিঙ্গদার স্টাফ রির্পোটার ইন্দোনেশিয়াঃ অনুষ্ঠানের আগে প্রাচীন রীতিতে প্রার্থনা ইন্দোনেশিয়ার প্রত্যন্ত এক দ্বীপ সুম্বার স্থানীয়দের মধ্যে চালু আছে বহু পুরনো এক প্রথা। সেখানে বিয়ে করার জন্য কনেকে অপহরণ করে আনা হয়। কিন্তু সম্প্রতি একটি মেয়েকে অপহরণের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ইন্দোনেশিয়ায় এই প্রাচীন প্রথাটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ এই বিতর্কিত প্রথা বিলোপ করা হবে ঘোষণা দিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় দুজন কর্মকর্তা বললেন, যে প্রকল্পটি তাকে দেখতে হয়, সেটির বাজেট যাচাই করে দেখার দরকার আছে। সেজন্যে তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে হবে সিত্রাকে।
২৮ বছর বয়সী সিত্রা একা একা দুজন পুরুষের সঙ্গে বৈঠকের কথা শুনে শুরুতে একটু নার্ভাস বোধ করছিলেন। কিন্তু অফিসে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে উদগ্রীব ছিলেন তিনি। কাজেই সব দুশ্চিন্তা দূরে ঠেলে তিনি এই বৈঠকে গেলেন। মিটিং শুরু হওয়ার এক ঘন্টা পর এই দুজন বললেন, তারা বাকি মিটিং করতে চান অন্য একটি জায়গায়। সিত্রাকে তারা সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের গাড়িতে উঠতে বললেন। কিন্তু সিত্রা বললেন, তিনি তার নিজের মোটরসাইকেলেই যাবেন। একথা বলে তিনি মোটরসাইকেলে উঠে চাবি ঢোকালেন। ঠিক তক্ষুনি আরেকদল পুরুষ এসে তাকে তুলে নিল।
বালি থেকে আরও পূর্বে প্রত্যন্ত এক দ্বীপ সুম্বা ওরা যখন আমাকে জোর করে গাড়িতে ঢোকাচ্ছে, তখন আমি লাথি মারছিলাম এবং চিৎকার করছিলাম। আমার নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। গাড়ির ভেতর দুজন লোক আমাকে ঠেসে ধরে রাখলো, বললেন তিনি। আমি জানতাম আমার কপালে কী ঘটতে যাচ্ছে। তাকে বিয়ের জন্য অপহরণ করা হচ্ছে। বিয়ের জন্য পাত্রী অপহরণ সুম্বার অনেক পুরনো আর বিতর্কিত এক রীতি। স্থানীয়দের কাছে এই প্রথা কাউয়িন ট্যাংক্যাপ নামে পরিচিত। কিভাবে এটি সেখানে চালু হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। সাধারণত পাত্র বা বরের পরিবার বা বন্ধুরা মিলে কনেকে অপহরণ করে নিয়ে আসে। ইন্দোনেশিয়ার নারী অধিকার গোষ্ঠীগুলো অনেকদিন ধরেই এই প্রথা বিলোপের দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু তারপরও বালির পূর্বদিকে সুম্বা দ্বীপের একটি অংশে এটি চালু আছে।
ঘোড়ায় চড়ে পাসোলা উৎসবে যোগ দিতে এসেছে সুম্বানিজ যুবকরা। সম্প্রতি দুটি কনে অপহরণের ঘটনার ভিডিও নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার এখন এই প্রথাটি বিলোপ করতে বলছে। আমার মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি গাড়ির ভেতর থেকে সিত্রা কোন রকমে তার প্রেমিক এবং বাবা-মাকে একটা মেসেজ পাঠাতে পারলেন। গাড়ি ততক্ষণে এসে পৌঁছেছে সনাতনি আমলের এক বাড়ির সামনে। কাঠের খুঁটির তৈরি বাড়িটির চালা চূড়াকৃতির। সিত্রা এবার বুঝতে পারলেন, যারা তাকে অপহরণ করেছে, তারা আসলে তার বাবার দিকের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। সেখানে বহু মানুষ অপেক্ষা করছিল। আমি আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা একটি ঘন্টা বাজালো এবং আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে দিল।
ইন্দোনেশিয়ার সুম্বা দ্বীপে খ্রীষ্টধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের পাশাপাশি কিছু প্রাচীন প্রকৃতি পুজার রীতি এখনো চালু আছে। নানা ধরণের অনুষ্ঠান আর বলি দেয়ার মাধ্যমে সেখানে আত্মাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। সিত্রা বলেন, সুম্বার মানুষ বিশ্বাস করে যখন আপনার কপালে পানির স্পর্শ লাগবে, তখন আর আপনি সেই ঘরের বাইরে যেতে পারবেন না। আমি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম কী হচ্ছে। কাজেই যখন তারা আমার কপালে পানি ছোঁয়ানোর চেষ্টা করলো, আমি মুখ ফেরানোর চেষ্টা করলাম, যাতে পানি আমার কপালে না লাগে। একটি ঐতিহ্যবাহী সুম্বা গ্রাম। বাড়ির চালার উপর থাকে অনেক উঁচু একটি চূড়া। তাকে যারা আটকে রেখেছিল, তারা অবশ্য বারবার বলছিল, তারা সিত্রাকে ভালোবাসে বলেই এই কাজ করেছে। এই বিয়ে মেনে নেয়ার জন্য তারা সিত্রাকে নানাভাবে চেষ্টা করছিল।
কাঁদতে কাঁদতে আমার গলা শুকিয়ে গেল। আমি মাটিতে পড়ে কাঁদছিলাম। আমার হাতে তখনো ধরা আছে মোটরসাইকেলের চাবি। আমি সেটি দিয়ে আমার পেটে মারছিলাম, সেখানে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছিলাম। বড় বড় কাঠের খুঁটিতে আমি মাথা ঠুকছিলাম। আমি যে এই বিয়ে করতে চাইনা, আমি চাচ্ছিলাম সেটা তারা বুঝুক। যাতে আমার জন্য তাদের মনে করুণা জাগে। এর পরের ছয়দিন সিত্রাকে কার্যত এই ঘরে বন্দী করে রাখা হয়। বসার ঘরে তাকে ঘুমাতে হচ্ছিল। আমি সারারাত কাঁদতাম, মোটেই ঘুমাতাম না। আমার মনে হতো আমি মারা যাচ্ছি। সেই বাড়িতে সিত্রাকে যে পানি বা খাবার দেয়া হতো, সেটা তিনি খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। তার সন্দেহ, এই খাবার বা পানি খাইয়ে তাকে বশীভূত করা হবে। যদি আমরা তাদের খাবার খাই, তখন আমরা তো এই বিয়েতে রাজী হয়ে যাব। সিত্রাকে গোপনে খাবার আর পানি সরবরাহ করতো তার বোন।
সিত্রার পরিবার তখন নারী অধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। গ্রামের মুরুব্বিদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে অনেক আলাপ-আলোচনার পর সিত্রাকে মুক্ত করা হলো। দরকষাকষির কোন সুযোগ নেই একটি নারী অধিকার সংগঠন পেরুয়াটি’ গত ৪ বছরে এরকম ৭টি কনে অপহরণের ঘটনা রেকর্ড করেছে। তাদের বিশ্বাস, ইন্দোনেশিয়ার এই দ্বীপটির প্রত্যন্ত এলাকায় এরকম বহু ঘটনাই ঘটছে। এদের মধ্যে সিত্রাসহ মাত্র তিনজনকে মুক্ত করা গেছে। সম্প্রতি যে দুটি ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল, তার মধ্যে একটি মেয়ের বিয়ে এখনো টিকে আছে।
পূর্বপুরুষদের কবরে প্রাচীন রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা করছে সুম্বানিজ নারী পেরুয়াটির স্থানীয় কর্মকর্তা আপ্রিসা তারানু বলেন, ওদের এই বিয়ে মেনে নিতে হয়েছে, কারণ এছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। কাওয়িন ট্যাংক্যাপ বা জোর করে কনে নিয়ে আসার ব্যাপারটা অনেক সময় পারিবারিক মধ্যস্থতায় বিয়ের মতো ব্যাপার। এখানে মেয়ের মতামত মোটেই গ্রাহ্য করা হয় না। তিনি বলেন, যারা শেষ পর্যন্ত এরকম বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তাদের নিজেদের সমাজে হেয় চোখে দেখা হয়।এদেরকে পুরো সমাজের জন্য অসন্মান বলে বর্ণনা করা হয়। লোকে বলে, তাদের আর বিয়ে হবে না, তাদের কখনো সন্তান হবে না। এসব কারণে অনেক মেয়ে এরকম ঘটনার শিকার হওয়ার পরও বিয়ে মেনে নেয়। সিত্রার ক্ষেত্রেও এসব কথাই বলা হয়েছিল তিন বছর আগে অপহরণের ঘটনার পর। কিন্তু সিত্রা শেষ পর্যন্ত তার প্রেমিকের সঙ্গেই ঘর বাঁধতে পেরেছেন। তাদের এখন সুখের সংসার।
ভাইরাল হওয়া যে অপহরণের ভিডিও কনে অপহরণের রীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। ঈশ্বরের কৃপায় আমি আমার প্রেমিককে বিয়ে করতে পেরেছি। আমাদের এখন এক বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান আছে। এই প্রথা বিলোপের অঙ্গীকার স্থানীয় ইতিহাসবিদ ফ্রান্স ওরা হেবি মনে করেন, এই প্রথাটি আসলে সুম্বার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ নয়। কিছু লোক তাদের পছন্দের মেয়েকে জোর করে বিয়ে করার জন্য এটি ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, স্থানীয় নেতা এবং কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়া হয় না বলেই এটি এখনো চলছে। এর বিরুদ্ধে কোন আইন নেই। যারা এই প্রথা চালু করে, তাদের হয়তো সামাজিকভাবে নিন্দা করা হয়, কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোন আইনি শাস্তির ব্যবস্থা নেই, নেই কোন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ।
নারী অধিকার মন্ত্র্রী বিনটাং পুস্পায়োগা তবে এবার এরকম অপহরণের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে যেরকম শোরগোল হয়েছে, তারপর সুম্বার আঞ্চলিক নেতারা একটি যৌথ ঘোষণায় সই করেছেন। এ মাসের শুরুতে এই ঘোষণায় তারা এরকম জোর করে কনে অপহরণের রীতি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার নারী অধিকার মন্ত্রী বিনটাং পুস্পায়োগা এই ঘোষণা সই করার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে জাকার্তা থেকে সুম্বায় আসেন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অভিভাবক এবং ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে আমরা জেনেছি, এভাবে কনে অপহরণের ঘটনা, যা কিনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, তা আসলে সুম্বার আসল ঐতিহ্য এবং রীতির অংশ নয়। তিনি এই রীতিকে ‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সরকার এর বিরুদ্ধে আরও ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, এই ঘোষণা স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই এটি শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
নারী অধিকার গোষ্ঠীগুলো সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি অনেক দীর্ঘযাত্রার একটি প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। সিত্রা বলেছেন, সরকার যে এখন এই ঘটনার দিকে নজর দিচ্ছে, সেজন্যে তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি যে নির্মম অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, আর কেউ সেরকম দুর্ভাগ্যের মুখোমুখি হবেন না বলে আশা করছেন তিনি। অনেকের মনে হতে পারে, এটা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া একটা রীতি। কিন্তু এটা এখন একটা সেকেলে রীতি, এ যুগে এর স্থান নেই। কাজেই এটা বন্ধ করতে হবে, কারণ এটা মেয়েদের ক্ষতি করছে। *সিত্রা ছদ্মনামটি ব্যবহার করা হয়েছে তার প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখার জন্য।